নারীও মানুষ আসুন এই মানুষের যন্ত্রণা বুঝি

কৃষি, সন্তান পালন অথবা ঘর গেরস্থালীর কাজে নারী শ্রমকে সামাজিকভাবে অস্বীকার করা এবং এর কোন আর্থিক মূল্য নিরূপণ না করা নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে যেখানে ধর্মপাশার একটি ছোট্ট এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক। গতকাল ছিল বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখে গ্রামীণ নারীরা কেমন আছেন সেই সত্যানুসন্ধান প্রয়াস থেকেই এই প্রতিবেদন। বলাবাহুল্য দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে বলে ব্যাপক আলোচনা হয়, এবং সত্যিকার অর্থে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষমতায়ন হয়েছে সত্য, কিন্তু প্রান্তিক নারীদের অবস্থান এখনও আগের মতই অবহেলিত। বলাবাহুল্য যেসব নারী বাইরে শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করেন আংশিকভাবে তারা ব্যতিত অন্য নারীদের কর্মের কোন স্বীকৃতি নেই আমাদের সমাজে। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একটুও বদলায়নি। মানসিকতায় গেড়ে থাকা নারীকে যন্ত্রবৎ দেখার প্রবৃত্তি পাল্টায়নি একটুও। পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কর্মজীবী, এমন পরিবারের নারী-পুরুষ দুইজন বাইরের কাজ শেষে ঘরে আসার পর ঘরের যাবতীয় কাজ সামলানোর দায়িত্ব নারীকেই গ্রহণ এবং পুরুষ কর্মজীবীর আয়েশিয়ানা এখনও আমাদের প্রতিটি পরিবারের স্বাভাবিক চিত্র। ঘরে কোন ধরনের কাজ করাকে অপৌরুষেও যা আবার অপমানজনক বলে বিশ্বাস করে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, বরং এইসব কাজ নারীদেরই সামলানোর দায়িত্ব বলে প্রচ- বিশ্বাস, সেই জায়গায় একদিন নারীর অবস্থা ফিরে দেখে অবস্থার ইতর বিশেষ পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও এইসব দিবসকে সামনে রেখে আসলে আমরা আয়নায় দেখার মত নিজেদের চেহারাটা দেখতে পারি।
সভ্যতার শুরুতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকাই ছিল অগ্রগণ্য। পরে নারীকে অবরুদ্ধ করে অন্তপুরবাসিনী বানিয়ে ফেলা হয়। নারীর কাজকে তখন থেকেই মূল্যহীন ভাবার দিন শুরু। এর পর থেকে নারীর হীন অবস্থান দিনকে দিন শুধু বেড়েছেই। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে তথা নারীকে সমমর্যাদা দিতে হলে নারী-পুরুষ বিভাজন ভুলে গিয়ে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করাটাই জরুরি। বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্যগুলোকে অস্বীকার করে নারীকে কেবল নারী বলে আলাদা করে দিলে কোন সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আজ নারীর শ্রমের মূল্য নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের পুরুষরা কি তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন? উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, শ্রমজীবী মানুষের শ্রম শোষণ করে একটি সংখ্যাল্প শ্রেণি রাতারাতি অতি ধনীতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। নারীকে আলাদা করে দিলে ওই শ্রম শোষণের জায়গাটিকে আড়াল করে ফেলা হবে। নারী যেমন পুরুষ দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে তেমনি এই শোষণমূলক সমাজ কাঠামো দ্বারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সিংহভাগ মানুষই কোন না কোন ভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে। শোষণের ওই জায়গাটিকে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে নারী-পুরুষদের জাগাতে পারলেই যেমন সমাজ থেকে বিদায় নিবে অসাম্য তেমনি নারীর প্রতিও সমাজের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে। বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলনের নামে এনজিও কার্যক্রম কিংবা লোক দেখানো যেসব তৎপরতার দেখা মিলে সেগুলো নারীর বৈষম্য রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।
সুতরাং বিশ্ব নারী দিবসকে সামনে রেখে নারীকে প্রথমে মানুষ বিবেচনা করে আসুন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব ধরনের অসাম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলি।