নারীকেন্দ্রিক নয় বরং মানুষকেন্দ্রিক চিন্তার প্রসার কাম্য

পুরাণ মতে দেবী দুর্গা নারী শক্তির প্রকাশ। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যত পুজোআর্চা করে থাকেন তার মধ্যে নারী দেবীর সংখ্যা প্রচুর। দুর্গা দেবী ছাড়াও, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, উষা, বিপদনাশিনী, জগদ্ধাত্রী, বাসন্তী, কাত্যায়নী, মনসা; প্রভৃতি নারী দেবীরা বিপুল ভক্তি সহযোগে পূজিতা হন। বৈদিক দেবতার বাইরে অসংখ্য লৌকিক নারী দেবীর উপস্থিতিও আমরা দেখি। সনাতন ধর্মে এই বিপুল সংখ্যক নারী দেবীর উপস্থিতি থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, সেই পৌরাণিক যুগে নারীর অবস্থান অধস্থন ছিল না। বরং পুরুষের সাথে সমমর্যাদায় নারীরা অধিষ্ঠিতা ছিলেন। স্বয়ং ঈশ্বর পুরুষ রূপে কাউকে বেশি প্রাধান্য দেননি। পুরুষ ও নারী উভয় রূপকেই তিনি সৃষ্টির কাজে অসম্ভব কুশলতায় ব্যবহার করেছেন। আজ যখন নারীবাদীরা নারী স্বাধীনতা কিংবা সমানাধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার তখন ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির সেই পৌরাণিক ইতিহাস তথা নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টি অবশ্যই বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য। মানব সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মানুষ যখন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করল তখন নারীরাই সেই প্রক্রিয়ার প্রধান শক্তি হয়ে উঠলেন। পরে ক্রমশ পুরুষরা শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসল আর নারীদের বাহির থেকে ঠেলে অন্তপুরে ঢুকিয়ে দিল। সন্তান উৎপাদন ও ঘর-গেরস্থালির বাইরে অন্য সকল দায়িত্ব থেকে নারীকে অব্যাহতি প্রদান করে চরম পুরুষতান্ত্রিকতা পৃথিবীর পরবর্তী সভ্যতাগুলোকে চরমভাবে একদেশদর্শী করে তুলল। সেই যে নারী অন্তপুরবাসিনী হলো তার আর তেমন করে ডানা মেলা হল না। আধুনিক যুগে এসে নারী ও পুরুষদের সচেতন অংশ উপলব্ধি করল মানুষের লৈঙ্গিক অবস্থানকে বৈষম্যম-িত রেখে সমগ্র মানব জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী মুক্তির দুইটি ধারা তখন থেকে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হতে থাকল। একটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে এক কাতারে নিয়ে আসার মানবিক প্রচেষ্টা আরেকটি নারী নেতৃত্বের অধীনে নারীমুক্তি আন্দোলন। বলাবাহুল্য শেষোক্ত ধারায় প্রায়ক্ষেত্রেই পুরুষকে নারীর প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ শ্রেণি বিভাজিত সমাজে নারীর সাথে পুরুষরাও সমান পীড়নের শিকার। প্রথমোক্ত ধারাটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের মুক্তির কথা বলে, যেখানে লৈঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো কিছু বিবেচনাযোগ্য নয়। এই দুই ধারার প্রভাবে সমাজ থেকে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আজ অনেক পালটেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত, কর্মজীবী ও স্বচ্ছল নারীরা এখন অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেন। যদিও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর পরিবারগুলোর নারী-পুরুষরা বহুমুখী বৈষম্যের শিকার হয়ে আজও মুক্তির জন্য ছটফট করছে।
শহরের কালীবাড়ি সাবজনীন দুর্গা পূজা উদযাপন কমিটির সকলেই নারী, এমন একটি সংবাদ পরিবেশন হয়েছে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। বলা হচ্ছে নারী নেতৃত্বে জেলার প্রথম পূজা কমিটি এটি। এই নারী নেতৃত্বে গঠিত কমিটিটি শেষোক্ত ধারার নারীমুক্তি ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ। এখানে কমিটিতে কোনো পুরুষের উপস্থিতি না থাকার অর্থ হলো পুরুষকে উপেক্ষা করা। এটিও লৈঙ্গিক বৈষম্যতাড়িত দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা খুশি হতাম যদি পূজা কমিটিটি নারী-পুরুষ দ্বারা ভারসাম্যপূর্ণ হত। এই স্তম্ভের প্রথেমেই আমরা উল্লেখ করেছিলাম, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসাসৃত পুরাণে পুরুষ দেব আর নারী দেবীর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বজায় ছিল। ঈশ্বরের ইচ্ছা মূলত এমনই। ঈশ্বরের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে পুরুষরা ¯্রফে স্বার্থতাড়িত হয়ে এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সমাজের অর্ধেক মানবশক্তি নারী-সমাজকে যে সামাজিক শিকলে বেঁধে রেখেছিল সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে নারীকেন্দ্রিক নয় বরং মানুষকেন্দ্রিক ও শ্রেণিভিত্তিক চিন্তার প্রসার কাম্য। নারী শক্তির প্রতীক দুর্গা দেবীর পুজোর উৎসবমুখর সময়ে এই আমাদের কামনা।