নারীর অবমূল্যায়িত কাজকে দিতে হবে স্বীকৃতি

এনামুল হক এনি
বর্ষায় হাওরের অথৈ পানি হাওরপাড়ের গ্রামীণ জীবন প্রায় ছয় মাস আবদ্ধ থাকে। আবদ্ধ পরিবেশেই গবাদি পশু লালন পালনের কাজটি করতে হয় কৃষক পরিবারকে। তখন আর গবাদি পশুকে মাঠে চড়ানোর মতো কোনো সুযোগ থাকে না। গোয়াল ঘর, বাড়ির উঠানে রেখে কোনো রকমে গবাদি পশুর যতœ নিতে হয়। হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা বোরো ফসল ঘরে তোলার পর অবসর সময় কাটায়। এবাড়ি ওবাড়ির আলগাঘরে (বাড়ির মূল ঘরের বাইরে মেহমানদের জন্য অতিরিক্ত ছোট ঘর)। গল্প আড্ডায় সময় কাটে তাঁদের। তখন গবাদি পশুর দেখাশোনা বা যতœ নেওয়ার প্রধান দায়িত্ব বাড়ির নারী সদস্যদেরকেই পালন করতে হয়। বৈশাখে জমিয়ে রাখা শুকনো খড়, ভাতের মাড়, বাজার থেকে কিনে আনা কুড়া, ভূসি গবাদি পশুকে খাওয়ানোর পাশাপাশি গোয়াল ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ নারীদের সামলাতে হয়। রান্নার কাজের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহারের জন্য গরুর গোবর দুই বা আড়াই ফুট লম্বা পাটকাটিতে লাগিয়ে ও খড়ের সাথে মিশিয়ে বিশেষ জ্বালানি তৈরির কাজটিও করতে হয় নারীদের। স্থানীয়ভাবে এসব জ্বালানির নাম ‘মুইট্যা’ বা ‘ঘষি’। শুকনো মৌসুমে তৈরি এসব ‘মুইট্যা’ বা ‘ঘষি’ পুরো বর্ষা মৌসুমে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
দীর্ঘ বছর ধরে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের কাজিরগাঁও, শরীয়তপুর, শান্তিপুর, ইসলামপুর, বেরিকান্দা, গোলপকপুর গ্রামের কৃষকেরা আলু, মরিচ, টমেটো, মুলা, লাউ, বেগুন, ফুলকপি, বাধাকপি, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন জাতের শীতকালীন সবজি চাষ করে। এ সময় পুরুষেরা জমি তৈরির কাজটি করে দিলেও চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে চারা বপন করার কাজটি করে পরিবারের নারী সদস্যরা। পুরুষ সদস্যরা হাওরে বোরো ফসল তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকায় জমি নিড়ানো, পানি দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে পরিচর্যার কাজটিও করতে হয় নারীকে। উৎপাদিত এসব সবজি জমি থেকে উত্তোলনের পর বাজার উপযোগী করে তোলার কাজেও রয়েছে এখানকার নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। গোলকপুর গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন জানালেন, শরীয়তপুর গ্রামের ইদ্দি মিয়া, স্বপন মিয়া, ইসলামপুর গ্রামের আজগর আলী ইতোমধ্যে তাঁদের জমিতে টমেটো চাষ শুরু করেছেন। এতে তাঁদের পরিবারের নারী সদস্যদের ভূমিকাই বেশি। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের পোল্ট্রি ফার্মগুলোতে পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ দ্বিগুণ। ধর্মপাশা সদর ইউনিয়নের নোয়াবন্দ, আবুয়ারচর, হলিদাকান্দা গ্রামে হপেশ আলী, আনোয়ার হোসেন, করিম মিয়া, লায়েছ মিয়া, আপিল উদ্দিনেরসহ অন্তত ৮/১০টি পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে। এসব পোল্টি ফার্মে পুরুষের তুলনায় পরিবারের নারী সদস্যদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বসতবাড়ির সবজি/ফল উৎপাদন ও পশু সম্পদ যেমন, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল প্রভৃতি উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণ ৪৫-৮৫ ভাগ। পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে নারীদের ভূমিকা প্রধান এবং সবজি বাগান ও পশু সম্পদ থেকে আয়ের ক্ষেত্রে ২০-৪০ ভাগ অবদান রয়েছে নারীর। মাছ ধরার পর মাছ বাছাই, কাটা, শুকানো ও বাজারজাতকরণের উপযোগী করার দায়িত্ব পালন করে নারীদের। এ ছাড়া গ্রামীণ নারীরা বর্তমানে জৈব সার বা কম্পোষ্ট তৈরি ও ব্যবহারের মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য রক্ষা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখছে। দেশের বাংলাদেশের ৪৩.৩ শতাংশ নারী ও ০.৯ শতাংশ পুরুষ পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালি কাজে যুক্ত আছে। ৯.৪ শতাংশ নারী ও এবং ৩৪.৫ শতাংশ পুরুষ পুরোপুরিভাবে অর্থ উপার্জন কাজে নিয়োজিত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর মজুরীবিহীন এবং স্বীকৃতিহীন কাজ বা অবদানের আর্থিক মূল্য নিরূপণ এবং জিডিপি’র মানদ-ে তার তুলনা করার উদ্দেশ্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এবং মানুষের জন্য ফাইন্ডেশন এর যৌথ উদ্যোগে ‘জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান নিরূপণ : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীষংক একটি গবেষণা করা হয়েছে। এই গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের একজন নারী সমবয়সি একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিনগুণ সময় এমন কাজে নিয়োজিত থাকে যা জিডিপিতে ধরা হয়না। একজন নারী মজুরিবিহনী কাজে প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘন্টা এবং একই কাজে একজন পুরুষ প্রতিদিন ২.৫ ঘন্টা সময় ব্যয় করে। একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২.১টি মজুরিবিহীন কাজ করে, যা জিডিপিতে যোগ করা হয় না। পুরুষের ক্ষেত্রে এ ধরণের কাজের সংখ্যা ২.৭টি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ নামের আমাদের একটি প্রচারাভিযান রয়েছে। নারীর অস্বীকৃত কাজ যদি মূল্যায়ন করা হতো এবং স্বীকৃতি দেওয়া হতো তাহলে নারীর মর্যাদা বাড়তো সংসারে ও সমাজে। নারীর মর্যাদা বাড়াতে হবে। এটার একটা কৌশল হিসেবে আমরা বলছি যে, নারীর যত অস্বীকৃত কাজ আছে সেগুলো এক সাথে মূল্যায়ন করে জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করা। তবে জিডিপিতে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়টি সহজ নয়। জিডিপি নির্ধারণ হয় সারা বিশ্বের একটি স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেমে। এটাকে বলা হয় সিস্টেম অব ন্যাশনাল একাউন্টিং। সেটা করা সম্ভব না। কিন্তু আমরা যেটা বলছি সেটা প্রতিকী হিসেবে স্যাটেলাইট একাউন্টিং সিস্টেম করে আগামী বাজেটে দেখানো। যদি এটার মূল্যায়ন হতো তাহলে এটার মূল্য এতো হতো।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘বিভিন্ন দিবস পালন করা হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টি দেওয়ার জন্য। জাতিসংঘ বা বৈশ্বিক নারী মানবাধিকার আন্দোলন উন্নয়ন সংগঠনের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে হয়। এটা হঠাৎ করে হয়না। ঘোষণাটা হয়তো একদিনে হয়। কৃষিতে যে বিশাল সাফল্যের সামগ্রিক অগ্রগতি এর শুরুটা কিন্তু গ্রামের বাড়িতে। যে লাউ বা কুমড়া গাছটা হয় সেটার বীজ ঘরে কে রাখে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের নীতি নির্ধারকেরা বলেন, ‘কৃষক নারী’ বলে আলাদা কি?’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক বছর আগের কথা। রাজশাহীতে গরু ছিলনা। নারীকে দিয়ে লাঙ্গল টানানো হয়েছে। এখন গবেষণার ফলে পরিস্কারভাবে দেখা যায় যে নারীরা কি পরিমাণ কাজ করে। এখন নারী ফসল কাটায়, ফসল মাড়াইয়ে অংশগ্রহণ করছে। গ্রামে মেয়েরা লাইন বেধে বীজ বপন করছে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বইয়ের প্রচ্ছদে দেখা যায়, নারীরা উপুর হয়ে কাজ করছে। কৃষিতে ২১টি কাজের মধ্যে ১৯টিই সম্পন্ন করছে নারী। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে যে কৃষক নারী পেশাদার হিসেবে এ কাজটি করছে তারা সামন মজুরী পাচ্ছে না।’
আয়শা খানম বলেন, ধান মাড়াইয়ের পর সিদ্ধ করা, ধান ভানা, ভাত সিদ্ধ করে পাতে এনে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করছে নারী। জিডিপির হিসেবে জাতীয় অর্থনৈতিক যে সূচক সেখানে এটা বিবেচনায় নিয়ে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে কৃষক নারীর বিশেষ ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। আমাদের যেটা করা দরকরা কৃষক নারী যারা আছে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া। অধিকার, সমধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উন্নয়ন সূচকে নারীর ভূমিকা দৃশ্যমান করা দরকার।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘কৃষিতে গ্রামীণ নারীর অবদান অনস্বীকার্য। অবদান এবং স্বীকৃতি দুটি আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে কৃষি বলতে শষ্য উৎপাদন, গবাদী পশু পালন, মৎস্য চাষকে বুঝায়। যদি কাজগুলো ভাগ করা হয় জমি প্রস্তুতকরণ থেকে শূরু করে একেবারে মার্কেটিং পর্যন্ত তাহলে দেখা যায় নারীরা প্রথমদিকে কাজের সাথে নারীরা বেশি জড়িত বেশি। নারীরা কাজ করছে কিন্তু যখন মার্কেটিংয়ের বিষয়টা আসছে বা টাকা পয়সার বিষয়টা আসছে তখন নারীর স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে চলে যাচ্ছে। ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে এটি হতে পারে। বলা হয়ে থাকে মার্কেটিংয়ে নারীরা কেন যাবে?’
মার্কেটিংয়ের সাথেই স্বীকৃতির বিষয়টা জড়িত জানিয়ে ড. ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘স্বীকৃতি তখনই আসবে যখনই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসবে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর কাছে আসেনা। কর্মী মৌমাছির মতো নারীরা কাজ করে। নারী ও পুুরুষের কাজগুলো ভাগ করে দেখা হয়। সবেচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে মার্কেটিংয়ে নারীদের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া। নারীদের বিনা পারিশ্রমিক শ্রমিক হিসেবে দেখা হয়। একটা নারী বান্ধব পলিসি করতে হবে। যে পলিসির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে।’
কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ অথচ কৃষিতে নারীর যে অবদান তার স্বীকৃতি মিলছে না। নারীর গৃহস্থালী কাজকে সমাজ নিত্যদিনের কাজের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। গ্রামীণ নারীরা জানেন না যে, তাঁদের কাজের মূল্য রয়েছে। নারীদের অবমূল্যায়িত কাজকে স্বীকৃতি দিতে হবে। নারী শ্রমকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে জাতীয় অর্থনীতিতে। আর এ ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।