নিউইয়র্কের দিনকাল

ইশতিয়াক রূপু
আরেকটি ভাল দিন আজ আমরা পেরিয়ে এলাম।১২ মে মঙ্গল বার। প্রিয়জন বিয়োগের কোন সংবাদ নেই।আগামিকাল ১৩ মে থেকে বছরের শেষ দিনটি যেনো এরকম স্বজন না হারানো দিন হয়।এই মুহর্তে নগরীতে যে বিষয়টি আলোচনার শীর্ষে তা হলো কবে থেকে নগরী আবার স্বাভাবিক হবে। খুলবে দোকান পাঠ আর নিউইয়র্কারদের আবার জীবন যাপনে নিষেধহীন চলা ফেরা। বাঙ্গালীদের বসতিপূর্ন এলাকা জ্যাকসন হাইট, জামাইকা, বর্ঙ্কস সহ ওজন পার্কের অধিবাসীরা সামাজিক দুরত্ব মেনে আচার পালন সহ ধর্ম কর্ম পালন করছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করছেন নিজ তাগিদে ও নিয়ম মেনে।পুরো বাংলাদেশী অভিবাসী সমাজে শোক আর কষ্টের ছায়া এখনো বইছে সমানে।
অপেক্ষাকৃত অনেক ক্ষুদ্র এই কমিনিউটিতে কভিড-১৯ তে আক্রান্তে হারিয়ে যাওয়া সবাইকে কেউ না কেউ চিনেন এবং জানেন বটে। অনেকেই আবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। হঠাৎ করে নেমে আসা এই অচেনা দূর্যোগ মোকাবিলায় ব্যাক্তি পরিবার সমাজ এমনকি সরকার পর্যন্ত তৈরী ছিল না বলে লক্ষ আমেরিকান সহ অভিবাসীদের অভিযোগ।যার চড়া দিতে হয়েছে আমেরিকার জনগনকে।সরকারের মুলকেন্দ্রবিন্দু সরকার প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভুমিকা নিয়ে নিজ দেশ ছাড়িয়ে সারা দুনিয়া জুড়ে নানা আলোচনা সমালোচনায় পুরো মিডিয়া জগত সরগরম।এতো সবের পর থেমে তো থাকা যাবে না। যেখানে বাকি দুনিয়ার কোন কোন দেশ পরিকল্পনা করে লকডাউন তুলতে চাইছে অর্থনীতি সচল করার স্বার্থে।বাকি দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সমান মাপের কদম ফেলে আমাদের কেও।তাই বাস্তব সিদ্ধান্ত।
সুনিদৃষ্ট সে ইস্যুতে আমাদের তথা নিউইয়র্কের বর্তমান সামগ্রিক অবস্থা কোথায় দাড়ানো আছে তার চুলচেরা বিশ্লেষন চলছে সর্র্বোচ্চ প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক লেভেলে। করোনায় সাধারন নিউইয়র্কারের মৃত্যু হ্রাস পেয়েছে উল্লেখ যোগ্য হারে। একপর ও মেয়রের আশংকা সোসাল ডিসটেন্স নীতি পালনে কড়াকড়ি আরোপে শিথিলতা মানেই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করা। করোনার ভয়বহতা ক্রমে নিম্নের দিকে নেমে আসছে পাশাপাশি হাসপাতাল ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। এরই সুত্র ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাইতে চাইছেন রাজ্য গভর্নর এবং নগর পিতা। এসবের মধ্যে উঠে আসছে করোনায় মৃত্য ঘটা অসহায়দের প্রতি ফিউনারেল হোমস পরিচালকদের অমানবিক কর্মকান্ড। ইতিমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে একটি ভুক্তভোগী পরিবার। তাদের অভিযোগ হতভাগ্যদের ইউ হাল ট্রাকে লাকড়ি রাখার মত স্তুপীকৃত করে অসম্মানজনক ভাবে রাখা হয়েছিলো। এমনকি ফিউনারেল হোমসের পাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিলো লাশ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর। এসব অভিযোগের তদন্ত চলছে বলে এক সূত্র থেকে জানা যায়। রাজ্য গভর্নর এখনো বার বার স্মরন করিয়ে দিচ্ছেন নিউইয়র্ক রাজ্যে করোনার মৃত্যু সংখ্যা রকেট গতিতে বৃদ্ধি পেতে হোমসে থাকা প্রবীনদের অস্বাভাবিক মৃত্যু বহুলাংশে দায়ী। তিনি বার বার হাসপাতালে থাকা রোগীদের জন্য প্রতিটি হাসপাতালের ডাক্তার নার্স সহ সকল স্বাস্থ্য কর্মী দের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। এদিকে কুইন্সের এলমাস্ট হসপিটালের প্রায় ৪ হাজার সেবা কর্মীদের জন্য চলতি বছরের শেষে বিনামূল্য অবকাশ যাপনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
আমেরিকার দুটো বৃহৎ সেবা প্রতিষ্ঠান হোটেল হায়াত ও আমেরিকান এয়ারলাইন্স এই অবকাশ যাপনের সম্পূর্ন ব্যয় বহন করবে। এই ঘোষনা হাসপাতালের সকল কর্মীদের মাঝে ব্যপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে। এর পরও থামছে না নাগরিক উৎকন্ঠা। আগামি দিনে ধেয়ে আসা অর্থনৈতিক সংকট সহ বেকারত্ব বৃদ্ধি এমন কি আসতে পারে ভয়াবহ খাদ্য সংকট। এ সবের মোকাবিলা করতে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ বাড়ছে অনবরত। একমাস পূর্বে সিনেটর খান্নার প্রস্তাবিত প্রতি আমেরিকান কে মাসিক দুই হাজার ডলার প্রনোদনা দেবার প্রস্তাব আবার বেশ নেড়ে চেড়ে উঠছে। ডজনের ও বেশি সিনেটর ইতিমধ্যে আনীত এই বিল কে জোরালো সমর্থন করেছেন। দাবী উঠেছে আগামি জুন মাসে থেকে প্রস্তাবিত প্রনোদনা প্রদান কার্য়ক্রম শুরু করা। তবে এই বিলের বিষয়ে বর্তমান সরকারের মনোযোগ পূর্বে আনীত বিলের সমউৎসাহ নেই বললেই চলে। বরং বিরোধী মতবাদে সয়ং রাস্ট্রপ্রধান সোচ্চার। তারপর ও আমেরিকার জনগন আশাবাদী। অনুদান আর আর্থিক সহযোগীতা নিয়ে জোরালো আবেদন কারীদের মধ্যে দেশের ৫২ রাজ্যের গভর্নরদের মধ্যে এগিয়ে আছেন নিউইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর এন্ড্রু কুওমো। তার সঙ্গে আছে নিউইয়র্কের আরেক করোনা যোদ্ধা মেয়র ডি ব্লাজিও।
বুধবার ১২ মে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আবারো কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট আর্থিক সহযোগীতা চাইলেন প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার যা শুধু মাত্র নিউইয়র্ক নগরীর ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক দের কল্যানে তথা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধ সহায়তা
হিসাবে। মেয়রের দাবীকৃত এই ডলার পরিমানের সঙ্গে রাজ্য গভর্নর যোগ করলেন আরো ৬১ বিলিয়ন ডলার। যা ব্যয় হবে পুরো নিউইয়র্ক রাজ্যের মানবিক সহায়তা সব রাজ্যের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করতে। যা রাজ্যের বেকারদের সংখ্যা হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখবে। রাজ্য ও নগর প্রশাসন কে আরেকটি বিষয়কে মোকাবিলা করতে হচ্ছে কঠোর হস্তে। লকডাউনের কারনে গ্রাহস্থ্য জীবনে যেমন সহিংসতা প্রায় ২১ % শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি জাতিগত সহিংস আক্রমন ও সমান হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার কারনে গত ১৫ দিনে প্রায় ৮ জন নিউইয়র্কার এ ধরনের সহিংসতায় প্রান হারিয়েছেন। দুঃখজনক এসব ঘটনা নগরীর প্রায় সব এলাকায় ঘটে চলছে। নভেল করোনার অন্ধ আক্রমনে লন্ডভন্ড নিউইয়র্ক নগরীর বাংলাদেশী অভিবাসী সমাজের বৃহৎ অংশের জীবিকা নির্বাহের অধিকাংশ মাধ্যমের কোনটি স্থবির আবার কোনটির কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ আছে। যদিও নগরীর নানা সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে শতকরা ৫০% শতাংশ পরিবার নানা রুপ সহায়তা পেয়ে আসছেন তারপর ও বর্তমানের এই বিরুপ অবস্থায় অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ সংকটে আছেন। এর পর আছেন অনেক আনডুকুমেন্টেড অভিবাসী যারা পার করছেন ভীষন সংকট মুহুর্ত। আর তাদের সবার এই খারাপ সময়ে এগিয়ে এসেছেন নিউইয়র্কের অনেক সামাজিক সংগঠন সহ প্রফেশনাল বিশিষ্ট জন। যাদের মধ্যে আছেন সমাজ সেবক, ডাক্তার এবং মুল ধারার রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব। উল্লেখ যোগ্যদের মধ্যে আছে নিউইয়র্কের মাতৃ সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটি, বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশন সহ আরো বেশ কয়টি ছোট বড় সংগঠন। এছাড়া করোনা যোদ্ধা বলে খ্যাত নগরের হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের জন্য এগিয়ে এসেছেন সিলেট সদর এসোসিয়েশনের নব নির্বাচিত কর্মকর্তা বৃন্দ। ব্যাক্তি পর্য়াযে যারা প্রথম থেকে ঘরে ঘরে খাদ্য সহায়তা সব মেডিকেল সহায়তা নিয়ে রাত ও দিনের যে কোন সময়ে উপস্থিত হয়েছেন তিনি ফ্লাশিং হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকার। আরো একজনের নাম না বললেই নয় তিনি হলেন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব জয় চৌধুরী। উনারা ছাড়া ও আরো অনেক বাংলাদেশী সমাজ সেবকরা জীবন বাজী রেখে দাঁড়িয়েছেন অসহায়দের পাশে। সব মিলিয়ে আজকের নিউইয়র্কের দিন রাত্রি শংকায় কাটলেও আবার স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখা আমরা দেখার
জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকবো আসছে দিনগুলিতে।