নিউইয়র্কের দিনকাল

ইশতিয়াক রূপু
২০২০ সালের ১৯তম সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস শুক্রবার ছিলো করোনার ছোবলে বাংলাদেশী অভিবাসী পরপারে যাওয়া শুরুর ৫১ তম দিবস। এদিন শুনা যায়নি কোন স্বজন হারানোর সংবাদ। শনিবার পাওয়া গেলো আরো চারটি শোক সংবাদ। চার মৃত্যর একজন সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার বিশিষ্ট সমাজ সেবক ব্রুকলীন বাসী মরহুম সাব্বির আহমদ খান(৬৬)। সে দিন ঘটে যাওয়া সকল মৃত্য শোককে ছাড়িয়ে গেছে এক তরুনী মায়ের মৃত্য সংবাদে।তমা চৌধুরী নামের ৩০বছরের তরুনী ২০১২ সালে আমেরিকা আসেন অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে। বিবাহিত জীবন শুরুর দুই বছরের মাথায় কোল আলো করে আসা আয়াদান নামের ছেলেটি ৬ বছরের মাথায় হয়ে গেলো এতিম। নিউইয়র্কের বাংলাদেশী অভিবাসী সমাজের অনেক পিতা মাতা সহ কন্যা বধুদের চোখ অশ্রুসজল করে দিয়েছে। তমা চৌধুরী নামের মেয়েটি পুরো নিউইয়র্ককে শোকাচ্ছন্ন করে গেলো। এ যেনো একটি জীবনের স্বপ্ন ডানা মেলতে না মেলতে বিলীন হয়ে গেলো দুর আকাশে। মধ্য সপ্তাহে নিউইয়র্কের মেয়র আর রাজ্য গভর্নর কে আবার চিন্তিত দেখা গেলো নতুন এক ইস্যু নিয়ে।সেই প্রধান ইস্যু ছিলো করোনা রোগের চিহ্ন নিয়ে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া এবং পরে তিন শিশুর মৃত্য। তবে তা নিয়ে বিস্তর গবেষনা চলছে শিশু মৃত্য রোধ কল্পে। পাশাপাশি রাজ্যের শীর্ষ রাজনীতিকদের আরো অনেক ভাবনা। যার প্রধান একটি হলো আর্থিক সংকট। মেয়র দাবী করছেন কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ পরিবহন শিল্প কে চলমান রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিলেন প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার। অথচ নিউইয়র্কের হাজার হাজার সম্মুখ সারির যোদ্ধারা লড়ছে জীবন বাজী রেখে যাদের মধ্যে আছেন স্বাস্থ্য কর্মী, পুলিশ ও অগ্নি নির্বাপক কর্মী। নগর কর্তৃপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পেতে চলছে অতি দ্রুত। যার পরিনতিতে জরুরী কাজে নিয়েজিত কর্মীদের লে অফ ঘোষনা করতে বাধ্য হবেন।মেয়র আবারো জোর গলায় মোটা অংকের আর্থিক অনুদান দাবী করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রামের নিকট।নিউইয়র্ক কে আবার সচল করতে হচ্ছে ধীরে চল নীতি অবলম্ব করে এবং সাবধানে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে করোনার আক্রমন নিয়ন্ত্রিত হলেও এখনো ঝুঁকি বর্তমান।
এখনো পর্যন্ত দোকান পাট বৃহৎ মল সহ হাজার হাজার গ্রোসারী দোকান ও ডেলী পুরোপুরি নয়তো আংশিক বন্ধ আছে। কর্মহীন ভাতার জন্য আবেদন করেছেন প্রায় ৫ কোটি কর্মক্ষম আমেরিকান। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫% শতাংশ। আগামির অনিশ্চিত সময়ে জনগনের বেঁচে থাকতে লড়াই করবার মূল হাতিয়ার হলো কর্মসংস্থান। অথচ কেউই বলতে পারছেন না কখনো আসবে সেই সময় যখন নিউইয়র্ক বাসীর জীবন যাত্রা হবে শতভাগ স্বাভাবিক। সে মুহুর্তের অপেক্ষায় থাকা নিউইয়র্কবাসী সহ কোটি কোটি আমেরিকানদের জন্য আরেকটি আর্থিক প্রনোদনা প্রদানের দাবী উঠছে দেশের সর্বত্র। বিপর্যস্থ অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রতি আমেরিকান কে দুই হাজার ডলার আর্থিক সহায়তা দেবার দাবী আজ পুরো
আমেরিকা জুড়ে।করোনা আক্রান্ত এবং করোনার কারনে মৃত্যর সংখ্যা বর্তমানে নিচের দিকে নামছে দেখে সবাই আরো বেশি করে সুসময় দেখার জন্য আগ্রহী।সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশ হয়ো ১০ মে রবিবার। মোট মারা যাওয়া নিউইয়র্কারদের মধ্যে হাসপাতাল মারা যান ১৬৪ আর নার্সিংহোমে ৪৩ জন। মোট ২০৭ জন। গর্ভনরের দেয়া এক পরিসংখানে জানা যায় নিউইয়র্কে করোনার ছোবলে মোট মৃত্যুর ৩৩% শতাংশ নার্সিংহোমে থাকা প্রবীন জনগোষ্টী। যাদের মধ্যে এক চতুর্থাংশ প্রবীন দের শেষ কৃত্য পালনে স্বজনরা এগিয়ে আসেনি। নগর কর্তৃপক্ষের নিজ হেফাজতে সেই হতভাগ্যদের শেষ কৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। নগরের মেয়র ডি ব্লাজিও এবং রাজ্য গভর্নর এন্ড্রু কুওমো রাতদিন লড়াই করে চলছেন নিরব ঘাতক করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে। গভর্নরের হস্তক্ষেপে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে নিউইয়র্কে পাতাল রেল সিস্টেমে। গৃহহীনদের করোনার আক্রমন থেকে বাঁচানোর প্রয়াসে তাদের কে পাতাল রেলের স্টেশন এবং কামরা থেকে উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে নিয়োজিত করা হয়েছে অতিরিক্ত ১ হাজার পুলিস সদস্য। রাত ১ টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত পুরো সাবওয়ে সিস্টেম সম্পূর্ন বন্ধ রেখো রেলের প্রতিটি কামরায় ছিটানো হচ্ছে জীবানুনাশক। জরুরী কাজে নিয়োজিত সকল যাত্রীদের জন্য এ উদ্দোগ কার্যকরী করা হচ্ছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। সমস্ত উদ্দোগ আর প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য নিউইয়র্ক কে আবার সচল করা। অবরুদ্ধ নিউইয়র্কে সোসাল ডিসটেন্স নীতি পালনে নগরীর পুলিস সদস্যের প্রতি উঠেছে বর্ণ বৈষম্যের অভিযোগ। কোথাও অভিযোগ উঠেছে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের। সিবিএস নিউজের দেয়া এক তথ্যে বলা হয় নিয়ম ভঙ্গ কারী অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ৩৪% শতাংশ কৃষ্ণাজ্ঞ এবং ল্যাটিন আমেরিকানরা। যদিও মেয়র ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ এসব অভিয়োগ করেছেন এবং অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। তবে আশ্বস্থ করেছেন এই বলে, এখন থেকে নজরদারী আরো বৃদ্ধি করা হবে যাতে কারো সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরন না করা হয়। বর্তমান সব কিছু ছাড়িয়ে মিলিয়ন ডলার মূল্যের যে প্রশ্নটি সবার মধ্যে সারাক্ষন ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো আমরা কবে আবার ফিরবো পূর্বাবস্থায়? কারন দুনিয়ার নানা প্রান্তর অভিজ্ঞ অর্থনীতি বিদ আর অভিজ্ঞ রাস্ট্রনীতিবিদ রা মনে করছেন নিউইয়র্ক তথা আমেরিকার নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল আর শক্তিশালী অর্থনীতি যখন উন্নতি আর সামগ্রিক স্বস্তির পানে ঘুরতে শুরু করবে তখন পুরো দুনিয়ার তাবৎ দেশ আর মহাদেশে হয়তো ফিরে আসবে পূর্বাবস্থা। আমরা কি সবাই এই বিষয়ে একমত?