নিভৃত সমাজসেবা

একই সমাজে সুর ও অসুর পাশাপাশি অবস্থান করে। যাপিত সময়ে দৃশ্যমানভাবে অসুরের সংখ্যা বেশি হলেও এই আঁধারে মাঝে মধ্যে আলোর ঝলকানির মতো কিছু সুরের সন্ধান মেলে। ভালো ও খারাপের সহাবস্থানের মধ্য দিয়েই মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে। যখন ভারসাম্য নষ্ট হয় তখনই আঁধার গ্রাস করে দুনিয়া। যদিও শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মানুষ মুক্তভাবে বসবাস করার সুযোগ পায় না, সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় এই তীব্র অসাম্য সত্বেও নানাভাবে মানুষ নিজের ভিতরের মানবতাবোধের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। এখনও প্রচারের পাদপ্রদীপের উষ্ণতার অপেক্ষা না করে কিছু মানুষ নিভৃতে সমাজসেবার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রেখেছেন বলে প্রায়শই নানা ঘটনাবলী থেকে ধারণা জন্মে। বর্তমান যুগ হলো প্রচার সর্বস্বতার যুগ। বিভিন্ন দুর্যোগকালে সহায়তা বিতরণ কালে নিজেদের দাতা হাতেমতাই প্রমাণের গলদঘর্ম অবস্থা দেখে অন্যরা লজ্জা পেলেও তারা এই দাতা পরিচয়ের মেকিত্বের খুশিতে গদগদ থাকেন। অনেকে আবার গরিবের সহায়তার নামে টাকা তোলে কিছু টাকা বিতরণ ও বাকিটা উদরস্ত করার খবরও শোনা যায়। এইরকম সময়ে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে সকলের শ্রদ্ধা কুড়িয়ে নেয়ার মতো একটি নাম জগন্নাথপুরের মকবুল হোসেন ভূইয়া ও তার মালিকানাধীন মাহিমা রেস্টুরেন্ট। জগন্নাথপুর পৌর শহরের ব্যারিস্টার আব্দুল মতিন মার্কেটে অবস্থিত এই রেস্টুরেন্টে প্রতি শুক্রবারে তিনি কাঙালি ভোজনের আয়োজন করে চলেছেন নিয়মিত। ২০১৭ সনে রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ যাবৎ তিনি এই মহৎ কাজটি প্রায় গোপনে করে আসছেন। এই কাজের জন্য তিনি কোনো প্রচার চান না। মনে নির্মল আনন্দ লাভের জন্য তিনি এ কাজ করেন। প্রথমে ৩০/৪০ জনের খাবারের ব্যবস্থা করলেও এখন এই সংখ্যা দুই শ’ বা তার উপরেও পৌঁছায় বলে জানা যায়।
দান খয়রাতের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন হলোÑ ডান হাত দিয়ে দান করলে যাতে বাম হাতেও সে খবর না জানে। অর্থাৎ দানের কথা চার কান করার কোনো সুযোগ নেই। যিনি দান গ্রহণ করেন তিনি যাতে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন না হন সেজন্যই ধমীয় এই বিধান। কিন্তু চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। নিজেকে দাতা প্রমাণের জন্য ব্যতিব্যস্ত কিছু মানুষ যখন ধর্মীয় এই অনুশাসনকে উপেক্ষা করে চলেছেন তখন মকবুল হোসেন এই আদর্শকেই আঁকড়ে ধরে নিরবে নিজের দানশীলতাকে অব্যাহত রেখেছেন। নেহায়েৎ পত্রিকায় স্বপ্রণোদিত খবর ছাপা হয়েছে বলে এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তির কথা আমরা জানতে পেরেছি। তার এই সমাজসেবামূলক মহৎ কর্ম দীর্ঘজীবী হোক। তাঁর এই কাজে কয়েকজন প্রবাসী সহায়তা করেন বলে জানিয়েছেন তিনি। আমরা জানি জগন্নাথপুর বা প্রবাসী অধ্যূষিত এলাকার বহু প্রবাসী এমন নিভৃত সমাজকর্মের সাথে যুক্ত রয়েছেন। এদের বেশির ভাগেরই খবর আমরা জানি না। তাঁরাও তেমন জানাতে আগ্রহী নন।
কেউ গরিব কিংবা কেউ ধনি হওয়ার বিষয়টি চলমান সমাজ কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত। সুষম বণ্টন ব্যবস্থা ও সমতামূলক আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম হলে ধনি-গরিব বৈষম্য আজকের মতো নিদারুণ অবস্থায় থাকত না। মূলত সমাজকে ওই প্রত্যাশিত সমতাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়াটা হলো প্রকৃত সমাজসেবা। বিচ্ছিন্ন সেবামূলক কর্মকা- থেকে সাময়িকভাবে কিছু মানুষ উপকার পেলেও এতে তার জীবনের পরিবর্তন ঘটে না। গরিব গরিবই থেকে যায়। তবে এই সমাজ কাঠামো পরিবর্তনটি একক কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। এটি সমষ্টিগত রাজনৈতিক আদর্শতাড়িত কাজ। এই ধরনের সমাজ পরিবেশ না আসা পর্যন্ত ব্যক্তিগত মহানুভবতা বা মহত্ত্ব কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এতে ব্যক্তির সংবেদনশীলতা ফুটে উঠে। আমরা কামনা করব মানুষের এই সংবেদনশীলতা একটি উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত হোক আর সেটি হবে ধনি-গরিব বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার।