নিমন্ত্রণের যন্ত্রণা

হরলাল সরকার
আমাদের প্রিয় সহকর্মী নবীন চন্দ্র রায় বড় ভাল মানুষ। গ্রামের বাড়ি তাহিরপুর উপজেলার পুণ্যভূমি শ্রী শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর মন্দির অতি সন্নিকটে রাজারগাঁও গ্রামে। উচ্চতায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, গায়ের রঙ গৌর বর্ণ না হলেও উজ্জল শ্যাম বর্ণ, দেখতে সুপুরষ বলা চলে; মাথায় চুল একটাও নেই বলে সৌন্দর্য হানি হয়নি। তবে মাঝে মধ্যে মাথা গরম হয়ে যেত। মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য সুগন্ধি জাতীয় তেল ও প্রাকৃতিক উপাদানীয় এটা ওটা দিয়ে আসতেন; যা নিয়ে আমাদের অফিসের সহকর্মী রেজানুল হক রাজা ও আতিকুর রহমান আতিক প্রায় সময়ই দুষ্টামি করে বলতেন এ নবীনদা তোমার মাথায় কি মেখে এসেছ? গন্ধে অফিসে থাকতে পারছি না। তুমি বাথরুম থেকে মাথা ধুয়ে আসো, তোমার মাথা থেকে কেমন গন্ধ বেরিয়ে আসছে। মাথা ধোয়া অবস্থায় দু’একদিন আমি নিজেও দেখেছি এবং বলেছি, তা হলে ওরা যে বলে, আপনার মাথায় চুল গজানোর জন্য কি সব মাখেন যা থেকে গন্ধ বেরোয়। নবীনদা বলেন, ‘‘রাজা, আতিক দুষ্টামি করে, আমার প্রেশার তাই মাথায় পানি দেই আর কি।’’ এ সব ঠাট্টা রসিকতার মধ্যে নবীনদা কিন্তু কোনদিন রাগ করেননি। সাংসারিক দিক দিয়ে খুবই বৈষয়িক বলা চলে। চাকুরীর পাশাপাশি এটা ওটা করে অতিরিক্ত দু’পয়সা কামানো উনার বড়ই আগ্রহ। উনার স্ত্রী মানে আমাদের বৌদিও বড় লক্ষ্মীমন্ত। উনিও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। নবীনদার যেমন সদা হাসিখুশি ব্যবহার, তেমনি শুনেছি বৌদির সুমিষ্ট আপ্যায়নের কথা। নবীনদা প্রতি বছর পণতীর্থ বারুনী মেলা আসার প্রাক্কালে একটি রশিদ বই নিয়ে হাজির হতেন। আর এসেই লম্বা করে নমস্কার দিয়ে রশিদ ধরিয়ে দিতেন। আমি আমার সাধ্যমত অর্ঘ্য প্রদান করলে উনার পক্ষ থেকে বিশেষ নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে যেতেন। এ ভাবে নবীনদাদা প্রায় বছরই চাঁদা নিয়েছেন আমিও কয়েক বছর পণতীর্থ ধামে গিয়ে স্নান করে মহাপ্রভুর মন্দিরে গিয়েছি কিন্তু কোনদিন নবীনদার বাড়ি যাইনি।
২০০৯ খিস্টাব্দ সনে গৌরীপুর থেকে আমার দিদি শাশুড়ি পণতীর্থ গঙ্গা স্নান করতে আসবেন, আমাকে অগ্রিম মোবাইল ফোনে জানানো হলো। ঐ দিন অফিসে এসেই চেয়ারে বসা মাত্র শ্রীযুক্ত নবীনবাবু শ্রীশ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর নামে রশিদ হাতে নিয়ে আমার কাছে আসতেই আমি বললাম,‘‘আরে নবীনদা আমি তো আপনার কথাই ভাবছিলাম, আপনি বড় ভাগ্যবান মানুষ, আপনি অনেক দিন বাঁচবেন’’। নবীনদা বললেন, ‘‘না দাদা আপনি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেন, বড় জায়গায় আছেনতো তাই কেউ কিছু বলে না।’’ আমি বললাম, খারাপ কিছু বলছি নাকি? উত্তরে নবীনদা বললেন, প্রতি বছরই নিমন্ত্রণ দিয়ে যাই। পণতীর্থ যান ঠিকই আমাদেরকে দর্শন দেন না, আপনার মত মানুষের দর্শন পেলে আনন্দিত হতাম।’’ আমি বললাম না নবীনদা, এবারও পণতীর্থ যাব এবং আপনার বাড়িতেই উঠব; তবে একা নয় আমার দিদি শাশুড়ি আসছেন গৌরীপুর থেকে, উনাকে পণতীর্থে স্নান করাতে নিয়ে যাব। বলে মানিব্যাগ বের করে কিছু অর্ঘ্য প্রদান করি। নবীনদা পুনরায় আমাকে পণতীর্থ ধামে যাওয়ার জন্য ও উনার বাড়িতে যাত্রী হতে নিমন্ত্রণ দিয়ে চলে গেলেন।
কয়েকদিন পরেই আসল সেই শুভদিন। দুদিন আগেই সিলেট হতে আমার এক শ্যালক পঞ্চম দাস দিদি শাশুড়িকে নিয়ে বাসায় আসলো। পরদিন রাত ১১:০০টা হতে মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে স্নানের যুগ। দুপুর ১:০০টায় আমার বাসা নতুনপাড়া হতে আমি, পঞ্চম আর দিদি শাশুড়িকে নিয়ে রওনা হলাম। যাবার সময় নবীনদাকে ফোন করে বললাম আমরা আসছি। সুনামগঞ্জ সাহেব বাড়ির ঘাট হতে খেয়া নৌকা ধরে মনিপুরী ঘাটে নামলাম। কিন্তু অস্বাভাবিক ভিড়, মোটর সাইকেলে যেতে হবে। কোনমতে একটি মোটর সাইকেল জোগার করা হলো। আমি আমার দিদি শাশুড়িকে নিয়ে উঠলাম এবং পঞ্চমকেও নেয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু মোটরসাইকেলওলা কিছুতেই রাজি না হওয়ায় পঞ্চমকে রেখে পণতীর্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। আমার দিদি শাশুড়ির বয়স প্রায় ৭০ বছর হবে। মোটরসাইকেলে চড়ে অভ্যাস নেই। চলা মাত্রই ভয় পেতে লাগলেন। বিকাল ৪:৩০টায় মন্দিরে পৌছলাম এবং নবীনদার বাড়ি গেলাম। নবীনদা বাড়িতেই ছিলেন তিনি আমাদেরকে উনার ঘরে বসালেন এবং উনার স্ত্রীকে আমার পরিচয় দিলেন। আমিও আমার দিদি শাশুড়িকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর নবীনদা উনাদের বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালেন। নতুন বাড়ি করেছেন। পুরাতন বাড়ি যাদুকাটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাই সামনের রূপা আমন জমিতেই নতুন বাড়ি করছেন। বেশ খোলামেলা পূর্বমুখী বাড়ি। বারান্দায় একটি ছোট কক্ষ ছিল সেখানে চৌকির উপর বেশ সুন্দর বিছানায় আমাকে বিশ্রাম করার জন্য বললেন, আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম আর ভাবলাম নদীতে স্নান, মহাপ্রভুর দর্শন শেষে মানুষ যখন একটু বসার জন্যও জায়গা পাবে না; আমি তখন এখানে দিব্যি আরামে ঘুমাতে পারব। আধঘন্টা বিশ্রাম নেয়ার পর মন্দিরের আশপাশ ঘুরে এসে দেখি বিছানার মধ্যে এক ভদ্রলোক শুয়ে আছেন, আমি ভাবলাম উনি আবার কোথা থেকে এলেন? তখন নবীনদা এসে উনি তার সমন্ধি বলে আমার সাথে পরিচয় করে দিলেন, ভদ্রলোক উঠে আমার সাথে করমর্দন করলেন। উনি সদূর ময়মনসিংহ থেকে এ দিনেই সস্ত্রীক এসেছেন। আমাদের আলাপচারিতার মাঝে তিনিও চা বিস্কুট নিয়ে যোগ দিলেন। চা বিস্কুট খচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি, বিছানাটা বেদখল হয়ে গেল না তো? যেই কথা সেই কাজ। নবীনবাবুর সমন্ধী ধীরেন্দ্র সাহা সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে নবীনদা সমন্ধী বঊকে কি যেন দেখাতে চলে গেলেন। আমিও একটু বিছানায় কাত হলাম কিন্তু চার পাঁচ মিনিট পরেই উনার নাক ডাকা এমনভাবে শুরু হলো যেন কুম্ভকর্ণ ঘুমাচ্ছে। কানে আঙ্গুল দিয়েও থাকতে পারছি না। উঠে গিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে মনটা একেবারে আনন্দে ভরে গেল। বৌদিসহ চার পাঁচ জন মহিলা বসে মিষ্টি লাউ, মিষ্টি আলু, ডাটা, বাঁধাকপির সবজি কাটছেন আর গামলায় গামলায় ভরছেন, আবার রান্না ঘরে মুগডাল পাক করা হচ্ছে গন্ধ বেরিয়ে আসছে। আরেক চুলায় বড় হাড়িতে অন্ন পাক করা হচ্ছে। ভাবলাম যাক বাবা, গঙ্গায় স্নান সেরে এখানে মুগ ডাল আর লাবড়া দিয়ে নৈশ ভোজ ভাল হবে। মনে মনে বলি, এর সাথে বেগুন ভাজা হলে ভাল হতো। তারপর আমার দিদি শাশুড়ির খোঁজ নিলাম, দেখলাম ঘরের মধ্যে পাতা একটি চৌকির এক কোণে বসে আছেন, দিদি শাশুড়ি আবার সারা দিন উপবাস রয়েছেন; আস্তে আস্তে বললাম, দিদিমা স্নান সেরে এখানে এসো,  ভুরিভোজনটা ভালই হবে। দেখেন কত আয়োজন ।
দেখতে দেখতে রাত ১১:০০ টা বেজে গেল মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথি শুরু হলো। আমরা গঙ্গা স্নান করার জন্য যাদুকাটা নদীতে গেলাম। বিধি বিধান অনুযায়ী তর্পন স্নানাদি শেষ করে কাপড় পরিবর্তন করে দোকান থেকে বাতাসা কিনে শ্রী শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর মন্দিরে গিয়ে হরিলুট দিলাম এবং নিজেরাও অন্যদের দেয়া হরিলুট নিয়ে আবারও মন্দিরে প্রণাম করে আহারের উদ্দেশ্যে নবীনদার বাড়ি গিয়ে একেবারে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। গামলা গামলা তৈরি সবজি নেই, মুগডাল, অন্ন কিছুই ঘরের মধ্যে নেই। আর একটু উঁকি দিয়ে দেখলাম রান্না ঘরে দু’একজন অতি নিকট আত্মীয় লুকিয়ে লুকিয়ে কি যেন খাচ্ছে। নবীনদার খোঁজ করলাম কিন্তু কোথাও পেলাম না। তা হলে নবীনদা কি অন্তর্ধান হলেন? এসব চিন্তা করতে লাগলাম, ব্যাপার কি? উত্তর পেতে বেশি বিলম্ব হলো না। ঘরের গামলায় তৈরি সবজি, মুগডাল, অন্ন, আলুভাজি সব দোকানে চলে গেছে। দুই বছর আগে যখন এসেছিলাম তখন রাজারগাওয়ের সব লোকজনেই বারুনী  উপলক্ষে এ ধরণের সাময়িক হোটেল দিয়েছিল বলে দেখেছিলাম এবং আমি নিজেও এ সব হোটেলে লাবড়াসহযোগে অন্ন ভক্ষণ করেছিলাম। এ সময় মিষ্টি লাউ এর দাম খুব কম থাকায় দু’দিনেই বেশ ব্যবসা হয় তাদের। ঐ বছর নবীনদারও দোকান ছিল। এ নিয়ে পরবর্তীতে অফিসে নবীনদাকে কয়েক দিন লাউ এর ব্যবসায়ী বলে ক্ষেপিয়েছি কিন্তু তাই বলে নবীনদা নিমন্ত্রণ করে এনে অতিথিদের না খাইয়ে অন্তর্ধান হবেন এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দিদিমাকে বললাম, চলুন তাড়াতাড়ি বিদায় হওয়া যাক। এ ভাবেই নবীনদার বাড়ি ত্যাগ করে আবার মন্দিরের কাছে এসে যাদব রায়ের হোটেলে মুগডাল, আলু ভাজি, লাবড়াসহযোগে অন্ন খেয়ে বিল পরিশোধ করতে ক্যাশ কাউন্টারের কাছে যেতেই দেখি পাশের হোটেলে নবীনদা ক্যাশ কাউন্টারে বসে দ্রুত অন্ন বিক্রির বিল নিচ্ছেন। কোন দিকে তাকানোর সময় নেই। পাছে নবীনদা আমাকে দেখে ফেলে আর উভয়েই বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়, তাই আমিও দিদিমাকে নিয়ে দ্রুত এ স্থান হতে অন্তর্ধান হলাম।