নিরাপদ পানির চরম সংকট

বিন্দু তালুকদার
জৈষ্ঠ্যের প্রচ- তাপদাহে শহরকেন্দ্রীক জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত গরমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকা ও নিরাপদ পানির টিউবওয়েলগুলো নষ্ট থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সুনামগঞ্জ শহরের প্রধান ব্যবসা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার টিউবওয়েলগুলো নষ্ট ও অকেজো হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু টিউবওয়েল অকেজো না হলেও চাহিদামত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পৌরসভার প্যানেল মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল শুক্রবার বিকালে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, পৌর এলাকায় অন্তত দেড় হাজার টিউবওয়েল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এসব টিউবওয়েল মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। নতুন আর ২০০ টিউবওয়েলের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
জানা যায়, শহরের মধ্যবাজার, সুরমা মার্কেট, পৌর মার্কেট, কিচেন মার্কেটসহ আশপাশের খোলা জায়গার টিউবওয়েলগুলো দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে রয়েছে। এতে পবিত্র রমজান মাসে সন্ধ্যায় ইফতার তৈরি করা ও প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি পান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকেই। বোতলজাত পানি কিনতে হচ্ছে না হয় দূর থেকে পানি আনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। রমজানের শুরু থেকেই এই অবস্থা চলছে।
পৌর মার্কেটের টিউবওয়েলটি সম্প্রতি মেরামত করার পর কিছুদিন পানি পাওয়া গেলেও আবার নষ্ট হয়ে পড়েছে। কাজীর পয়েন্টে গত কয়েক বছর আগে একটি টিউবওয়েল বসানো হয়। কিন্তু এখন আর সেটির অস্তিত্ব নেই। ষোলঘর ও কাজীর পয়েন্টের মধ্যবর্তী রামৃকষ্ণ আশ্রমের পাশের টিউবওয়েলটি নষ্ট।
প্রধান প্রধান ব্যবসা কেন্দ্রের পাশে পৌরসভা কর্তৃক বসানো টিউবয়েলগুলো নষ্ট ও অকেজো থাকায় বিশুদ্ধ পানি নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ।
একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত গরমে পানি ছাড়া কি চলা যায়। ইফতারের সময় একটু ঠা-া পানি পান করব; কিন্তু আশপাশের সব টিউবওয়েলই নষ্ট থাকায় তা সম্ভব হয় না। হাত ধোয়ার পানিই পাওয়া যায় না। যারা বড় ব্যবসায়ী তারা বোতল কিনে নেন। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সকালে বা দুপুরে বাসা-বাড়ি থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে আসতে হয়। রোদের কারণে গরম হয়ে থাকা পানিই তাদের পান করতে হয়। নষ্ট টিউবওয়লগুলো মেরামত করতে পৌরসভার জরুরি কোন উদ্যোগ দেখছি না।
মধ্যবাজারের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাজেদা বেগম (৪৫) শুক্রবার বসা ছিলেন মধ্যবাজারের অকেজো হয়ে থাকা টিউবওয়লের পূর্ব পাশে। টিউবওয়েলটি কতদিন ধরে অকেজো অবস্থায় আছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘অন্তত এক বছর ধইরাই এইটা নষ্ট। মনে অয় পাইপ লিক-টিক অইছে। মেলা দিন দইরা পানি উঠে না। পশ্চিম বাজার থাইক্কা পানি আনতে অয়। হেইকান তাইক্কাও পানি আনন বড় ঝামেলা, ইফতারের আগে মানুষ লাইন ধরে।’
মধ্যবাজারের টিউবওয়েলের উত্তরপাশের কাপড়ের দোকান লাকি স্টোর। এই দোকানের কর্মচারী আমিনুল ইসলাম বলেন,‘ভাই কলটা অনেক দিন ধরেই নষ্ট। এইটাতে পানি উঠে না। পশ্চিম বাজার বা চাঁদনীঘাট থেকে পানি আনতে হয়। পশ্চিমবাজার থেকে পানি আনতে গেলে সময় নষ্ট হয়। চাঁদনীঘাটের কলের পানিতে দুর্গন্ধ করে।’
সুরমা মার্কেটের পেছনের পাবলিক টয়লেটের ইজারাদার ফিরোজ মিয়া জানান, মার্কেটের টিউবওয়েলটি থেকে পানি পাওয়া বেশ কঠিন। বৃষ্টি হলে কিছু পানি পাওয়া যায়। বৃষ্টি না হলে পানি পাওয়া যায় না। তবে সকালে কিছু সময় পানি উঠে। গত ফাল্গুন মাস থেকে এই অবস্থা চলছে।’
সুরমা মার্কেটের ব্যবসায়ী রিপন দাস জানান, টিউবওয়েলটি অনেকদিন ধরেই নষ্ট হয়ে আছে। অনেক ব্যবসায়ী উত্তম জলযোগ থেকে বোতল দিয়ে পানি আনেন। ’
উত্তম জলযোগের ম্যানেজার মিটু দাস বলেন,‘ভাই পানির জন্য আমরা একটা ডিপটিউবওয়েল বসিয়েছি। সরকারি টিউবওয়েল নষ্ট থাকায় প্রতিদিনই অনেক মানুষ আমার এখান থেকে পানি নেন। এতে আমাদের ঝামেলা হয়, লোকজনকে বাধা দেই। তারপরও তারা এসে পানি নেন, খাবার পানি না দিয়ে কি করব ?
সোনালী ব্যাংকের সামনে পত্রিকা বিক্রেতা মো. তজম্মুল হোসেন বলেন,‘রমজান মাসে পানি নিয়ে খুব দুর্ভোগে আছি। পৌর মার্কেটের টিউবওয়েলটি অনেকদিন নষ্ট থাকার পর মেরামত করা হয়েছিল। কয়েকদিন পানি আনার পর আবারও সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন মসজিদের ভেতর থেকে পানি এনে ইফতার করতে হয়।’ অনেকেই তাহিতি রেস্টুরেন্ট, দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার ও আনোয়ার মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে পানি নেন বলে জানান তিনি।
আনোয়ার মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক আনোয়ার হোসাইন বলেন,‘ পৌর মার্কেটের পেছনের টিউবওয়েল থেকে গত কয়েকদিন ধরে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অনেকেই আমার দোকান থেকে বোতলে ভরে পানি নিয়ে যান।’
পৌর মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মার্কেটের টিউবওয়েল থেকে বেশ কিছুদিন পানি পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে পৌরসভার মেয়র নতুন একটি বডি দিয়েছেন। এরপর কিছুদিন পানি উঠেছে, এখন আবার পানি উঠা বন্ধ হয়ে আছে। এতে মার্কেটের প্রায় পৌনে ৩শ’ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লোকজন পানির দুর্ভোগে রয়েছেন।’
সুনামগঞ্জ জেলা অটো টেম্পু, অটো রিকসা, হিউম্যান হলার মালিক সমিতির সভাপতি তাজিদুর রহমান বলেন,‘রাস্তা-ঘাটের পাশে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সরকারি টিউবওয়েল থাকলে সাধারণ মানুষের জন্য অনেক সুবিধা। আমাদের স্ট্যান্ডের কাছে কোন টিউবওয়েল না থাকায় চালক ও যাত্রীরা বিশুদ্ধ পানি সংকটে ভোগেন। বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশু ও নারীদের পানিতৃষ্ণা হলে বাধ্য হয়ে আশপাশে হোটেল-রেস্টুরেন্ট গিয়ে পানি পান করেন।’ পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে একটি টিউবওয়েল বসানোর দাবি জানান তিনি।
এ ব্যাপারে কথা বলতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলে ফোন রিসিভ করেননি পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত।
পৌরসভার প্যানেল মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল বলেন,‘পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াসহ নানা কারণে বেশকিছু টিউবওয়েল থেকে পানি উঠে না। ১০০ গভীর ও ১০০ অগভীরসহ মোট ২০০ টিউবওয়েলের জন্য ‘৩৭ শহর প্রকল্প’ পরিচালকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। আমরা আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি টিউবওয়েল বরাদ্দ পাব।’
তিনি আরও বলেন,‘প্রায় ৫০০টি টিউবওয়ল মেরামতের জন্য দরপত্র আহবান করে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। ঠিকাদার ইতোমধ্যে ১০০ টিউবওয়েলের যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছেন এবং মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। সকল টিউবওয়েলের কাজ দ্রুত শেষ করে শহরের সাধারণ মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা হবে।’