নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের এক বছর-অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই পূরণ হয়নি

আসাদ মনি
নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের একবছর পূর্তি হলো আজ। আজকের এই দিনে সুনামগঞ্জ শহরের সকল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। শিক্ষার্থীদের সকল দাবি প্রশাসন মেনে নিলেও বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়নি বলছেন আন্দোলনের সংগঠকেরা।
বাংলাদেশে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত সংঘটিত একটি আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ। ঢাকায় ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের রেষারেষিতে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহতসহ আরো ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশ জুড়ে আন্দোলন। সে আন্দোলনের ঢেউ লাগে সুনামগঞ্জেও। ৪ আগস্ট সুনামগঞ্জে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে। সংঘবদ্ধ বিক্ষোভের পাশাপাশি তারা শহরের বিভিন্ন মোড়ে গাড়ি আটকিয়ে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেছে শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন কিশোর বিদ্রোহ নামে খ্যাত। সাধারণ মানুষের পর্যালোচনা, রাষ্ট্র ৪৭ বছর ধরে যা করতে পারেনি আটদিনে স্কুলের শিক্ষার্থীরা করেছে। আন্দোলনের পর কয়েকদিন সড়কে শৃঙ্খলা দেখা গেলেও বেশিদিন তা কার্যকর থাকেনি।
জেলা বিআরটিএ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত অটো রিক্সা (সিএনজি) ২৩০০ টি, লেগুনা ২৮১ টি, জিপ গাড়ি ৪৬ টি, পিকাপ ২০টি, অটো টেম্পু ২৩৫ টি ।
সুনামগঞ্জ সিএনজি চালিত অটো রিক্সা, অটো টেম্পু ও ট্যাক্সি ক্যাব মালিক
সমিতির তথ্য অনুযায়ী জেলায় অটো রিক্সা (সিএনজি) ৩০০০ এর উপর। লেগুনা সাড়ে ৩শ।
ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকরা বলেছেন, নিবন্ধিত যানবাহনের চেয়ে নিবন্ধন
ছাড়া যানবাহনের সংখ্যা বেশি। এছাড়াও এই সব যানবাহনের চালকদের অনেকেই লাইসেন্সবিহীন। তারা বলেছেন, যে দাবিগুলো নিয়ে আন্দোলন করা হয়েছিল সেগুলো বেশিরভাগ এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহনে অর্ধেক ভাড়া বাস্তবায়িত হয়নি।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সংগঠক জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি দ্বিপাল ভট্টাচার্য্য বলেন, এক বছর পেরিয়ে গেলেও চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুসারে তেমন কিছুই করেনি প্রশাসন। পরিবহন সেক্টরের অরজাকতা এখনো দূর হয়নি। সুনামগঞ্জ শহরে পরিবহনের শৃঙ্খলা সন্তেুাষজনক হয়নি। ভাড়া নিয়ে তো অরাজকতা রয়েই গেছে, যেমন খুশি তেমন চলছে।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের নৈরাজ্য সামনে এসেছে আরো বেশি করে। সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কে বিআরটিসির ৬ টি বাস নামানো হয়েছে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। লক্কর-ঝক্কর বাস চলছে এখনো। রয়েছে অনেক অব্যবস্থাপনা চালক-হেলপারদের অশালীন আচরণ।
জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি দুর্যোধন দাস দুর্জয় বলেন, গত বছরের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অনেক দিন আটকে থাকা সড়ক পরিবহন আইনটি দ্রুততার সঙ্গে পাস করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলও থামছে না।
সুনামগঞ্জে আন্দোলনের সংগঠক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ১ বছর পূর্ণ হলো আজ। গুটিকয়েক স্কুলের সামনে কিছু জেব্রা ক্রসিং হয়েছে মাত্র। এদিকে থেমে থাকেনি দেশজুড়ে পরিবহন নৈরাজ্যের দুরন্ত ঘোড়া। কিছুদিন আগেও সুনামগঞ্জ-সিলেট রোডে বিআরটিসি বাস চালু নিয়ে স্থানীয় পরিবহন মাফিয়াদের নৈরাজ্যের শিকার হলেন সুনামগঞ্জের মানুষ।
তিনি আরো বলেন, পরিবর্তনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে ছাত্রদের নিয়ে গতবছরের এই দিনে যখন রাস্তায় আমরা নেমেছিলাম সে স্বপ্ন শুধু ছাত্রজনতার নয় বরং জাতীর স্বপ্ন ছিলো।
সুনামগঞ্জে আন্দোলনে আরেক সংগঠক নাছিম চৌধুরী বলেন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের আজ এক বছর পূর্তি হলা। আমরা যারা অবস্থান নিয়েছিলাম সবার মনে একটাই প্রত্যয় ছিলো, আমাদের সুনামগঞ্জ শহরের পরিবহন শৃঙ্খলা ফিরবে।
কিন্তু একবছরেরও আমাদের প্রশাসন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাতে পারেনি।
জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের ফলে নিবন্ধন ছাড়া গাড়ির সংখ্যা কমছে। মটর সাইকেলের শৃঙ্খলাটা আগের চাইতে অনেক বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু পরিবহন সিন্ডিকেটের কাছে সুনামগঞ্জের মানুষ অনেকটাই জিম্মি। এই সিন্ডিকেট এখনো পুরোপুরি ভাঙ্গা যায়নি।