নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা

সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় ঢাকার রাজপথে ছাত্ররা যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছিলেন তার মধ্যে যেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য তার সবগুলোই মেনে নেয়া হয়েছে। নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়ে প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে সঞ্চয়পত্র অনুদান দেয়া হয়েছে। নিহতের পরিবার পরিজন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া নিহত শিক্ষার্থীর বিদ্যায়তন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টম্যান্ট কলেজকে ৫টি বাস প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে স্পিডব্রেকার নির্মাণসহ বেশ কিছু দাবি দাওয়া মেনে নেয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে একটি শক্ত আইন অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। যে নৌপরিবহন মন্ত্রীর হাসি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ ব্যাপক গণমানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি স্বয়ং এ ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, মন্ত্রী নিহত শিক্ষার্থীদের বাসায় গিয়ে তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে উঠা ছাত্র আন্দোলন আপাতত সফল হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে সারা দেশে ছাত্র-ছাত্রীরা যে অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাতে জনমনে এই স্বস্তিটুকু এসেছে যে, যেকোন অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি এখনও বাংলাদেশে আছে। সহপাঠীর মৃত্যুতে বেদনার্ত শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্যিই এই শিক্ষার্থীরা শহীদ মতিউর রহমানের উত্তরসূরি। নবম শ্রেণির এই ছাত্র উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানে ঢাকার রাজপথে জীবন দান করেছিলেন। বারবার এই দেশের ছাত্র সমাজ দেশকে দিশা দেখিয়েছে সঠিক পথের। যাবতীয় আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রসৈনিকের ভূমিকায় ছিল জাগ্রত ছাত্রসমাজ। গত পাঁচ দিনের বাংলাদেশ আবার প্রমাণ করেছে সেই সংগ্রামী ছাত্র সমাজ আজও জাতির ক্রান্তিকালে ভূমিকা রাখতে জানে। অভিনন্দন, শুভেচ্ছা হে বীর শিক্ষার্থীরা।
আর কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় পরিস্থিতিকে ঘোলা করতে নানামুখী চক্রান্ত ষড়যন্ত্র কার্যকর রয়েছে। রাজনৈতিক দল বিশেষ নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে অন্যভাবে গোষ্ঠীবিশেষকে উসকে দেয়ার চেষ্টা করছে বলে প্রবল অভিযোগ রয়েছে। এই ধরনের অভিযোগ কোনভাবেই উড়িয়ে দেয়ার মত নয়। বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকের সাথে লন্ডনপ্রবাসী এক শীর্ষ নেতার টেলিফোন-আলাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তি পেয়ে যায়। প্রশ্ন আসতে পারে, কোন গোষ্ঠী বা শ্রেণির ন্যায়সংগত দাবি-দাওয়াকে সমর্থন করা তো একটি রাজনৈতিক দলের জন্য স্বাভাবিক বিষয়, তাহলে কেন এখানে এই সমর্থনকে ষড়যন্ত্র হিসাবে বলা হবে? এখানে আমাদের দেশের নির্বাচনকেন্দ্রীক প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যায় না কোন বড় দলকে। ক্ষমতাকেন্দ্রীক চর্চার বাইরে গণমানুষের স্বার্থে উচ্চকিত হওয়া আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন পরিহাসের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। যেমন বামধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ব্যঙ্গ্য পরিহাস করা হয়। এরকম বাস্তবতায় নির্বাচনের আগে যখন একটি বিশেষ শ্রেণির আন্দোলনে গোপনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে কোন রাজনৈতিক দল, তখন সেটি স্বাভাবিকত্ব হারায়। আর এ কারণেই হয়ে উঠে ষড়যন্ত্রের গন্ধযুক্ত।
ছাত্র সমাজকে রাজনীতির এই কুটিল খেলা সম্পর্কে সদা সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। কারও দাবা খেলার ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হওয়া যাবে না তাদেরকে কিছুতেই।