নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, হৃদয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের এই আর্তি উপলব্ধি করতে হবে

ঢাকার রাজপথে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটি আবারও জমে উঠেছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেসনালস’র ছাত্র আবরার হোসেনকে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস চাপা দিয়ে হত্যা করলে মঙ্গলবার থেকে এই আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। বুধবার দ্বিতীয় দিনের মত রাজধানীর কয়েকটি সড়কে শিক্ষার্থীরা অবরোধ করে তাদের ৮ দফা দাবি বাস্তবায়নে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের অভিনব আন্দোলনটি পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি কেড়েছিল। শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যাপক আকারের আন্দোলন করার নতুন একটি পথ দেখিয়েছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আন্দোলনের শেষ দিকে এখানে অনুপ্রবেশ ঘটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রবণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর। তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটিকে হিংসাত্মক ধারায় পরিচালিত করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার হীন চেষ্টায় নিয়োজিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস ও তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের প্রেক্ষিতে আন্দোলনটিকে বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৮ সনের কিশোর ছাত্র বিদ্রোহ খ্যাত এই আন্দোলনটি ভবিষ্যতে বহু কারণে গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হবে। যদিও ওই আন্দোলন থেকে বৃহত্তর অর্থে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর কোন ফল অর্জিত হয়নি তারপরও কিশোর শিক্ষার্থীদের আবেগমথিত, দেশপ্রেমবোধসম্পন্ন, ভীষণভাবে নিয়মতান্ত্রিক এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই আন্দোলনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যবহ থাকবে যুগ যুগ ধরে। মঙ্গলবার আবরার হত্যার পর আবারও ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন শুরু করেছে সেটিও গত বছরের ওই আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। আরও বলা যায়, গত বছরের আন্দোলনের ফলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের ব্যর্থতার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল আবরারের মৃত্যু সেটিকে পুনরায় উসকে দিয়েছে। ওই সময় যদি সড়ক শৃঙ্খলা স্থাপনে দৃশ্যমান ও কার্যকরী কিছু উদ্যোগের দেখা মিলত তাহলে আমাদের বিশ্বাস, এখনকার আন্দোলনটি এমনভাবে তৈরি হতে পারত না।
বাংলাদেশের মত জনবহুল এবং নি¤œ মধ্য আয়ের দেশে ভুজভাজির মতো একদিনে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরানো বহুমুখী কর্মকা-ের যোগফল। এর সাথে যেমন জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্নটি জড়িত তেমনি দরকার সংশ্লিষ্ট সকলের ইতিবাচক মানসিকতা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরাজিত অপরাপর অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাকে অপরিবর্তিত রেখে শুধু সড়কে শৃঙ্খলা স্থাপনের স্বপ্ন দেখা এক ধরনের পাগলামিও বৈকি। এটি যেমন রাজনৈতিকভাবে দেখতে হবে তেমনি এর সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতারও দরকার। এটি সকলেই জানেন। শিক্ষার্থীরাও জানেন। কিন্তু সমস্যা হলো বর্তমান অবস্থায় যেটুকু করা সম্ভব সেটুকুও করা হচ্ছে না। চোখের সামনে সড়ক পরিবহন সেক্টরের একটি মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় হয়ে পড়ার বাস্তবতা সকলেই দেখছেন। পথচারীদের সড়ক-নিয়ম না মানার দৃশ্য নৈমিত্তিক। দুর্ঘটনার পিছনে যানবাহন ও চালক যতটা দায়ী ততটাই দায়ী পথচারীদের নিয়ম না মানার বদভ্যাস। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে সড়কে বিরাজিত এই অরাজকতাগুলোকেই সরকারের সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন মাত্র। সরকারকে তাই ইতিবাচক মানসিকতা ও উদারতা নিয়ে হৃদয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের এই আর্তি উপলব্ধি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস স্থাপনের মত কাজ শুরু করতে হবে। প্রতিশ্রুতি যা দেয়া হবে তা যাতে শতভাগ রক্ষা করা সম্ভব হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে। তবেই অনাহুত ক্ষোভের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের স্থান শ্রেণিকক্ষে, রাজপথে নয়। তাই তাদেরকে বেশি সময় রাজপথে থাকতে দেয়া উচিৎ হবে না। বর্তমান বাস্তবতায় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের যেসব দাবি-দাওয়া সেগুলোকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল শান্ত করা যেতে পারে সহপাঠীকে হারানোর যন্ত্রণায় বিদ্ধ শিক্ষার্থীদের।