নির্বাচনকে ঘিরে যে স্বপ্ন আকাশে উড়ে

প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার মধ্য দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাচারণা পর্বে পা রাখলেন। সামনের ১৯ দিনের ক্লান্তিহীন প্রচারণায় প্রতিদ্বন্দ্বীরা ভোটারদের নিজ পক্ষে টানার চেষ্টা করবেন। এই ১৯ দিন বাংলাদেশের শহর-গ্রাম সর্বত্র ভীষণ রকম উৎসবমুখরতা বজায় থাকবে। দিন ও গভীর রাত পর্যন্ত এখানে ওখানে জটলা, শীতের আড়মুড়ি কাটিয়ে কর্মীদের দল বেঁধে ক্যাম্পেইন, পথসভা, পোস্টার-ব্যানার লাগানো; এসব চলতে থাকবে। চা-স্টলগুলোর ব্যস্ততা বাড়বে। তাদের আয়-রোজগার বাড়বে পাল্লা দিয়ে। কর্মীরা নতুন নোট পকেটে ঢুকিয়ে সোৎসাহে নিজ নিজ প্রার্থীর গুণগানে ব্যস্ত সময় পাড়ি দিবে। ব্যাংকের টাকা বাজারে আসবে। বাজার চাঙা হবে। অর্থনৈতিক কর্মকা- বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তেজি ভাব তৈরি হবে। একেবারে ব্রাত্যরাও আদাব-সালাম পেয়ে শরমে লাল হবেন আবার মনে মনে খুশি হবেন এই ভেবে যে, তারাও একান্তই অচ্যুত নন। পাঁচ বছরে হলেও নমস্যরা তাদের দুয়ারে আসেন। এবার শীতে হচ্ছে নির্বাচন। প্রচারণাপর্ব এগিয়ে যাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়বে শীতের তীব্রতা। দিনে মিঠে রোদ গায়ে লাগিয়ে প্রচারণা চালাতে বেশ আমেজ আসলেও রাতের ঠা-ায় সেই আমেজ প্রচ- বিরক্তিতে পরিণত হবে। লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আরাম করার বদলে কনকনে ঠা-ায় পথে পথে বেড়ানোর বিড়ম্বনা সইতে হবে প্রার্থী-কর্মীদের। গৃহবাসী মানুষ সময়ে-অসময়ে ঘরে নির্বাচনপ্রিয়দের আগমনে ব্যতিব্যস্ত হবেন-খুশি হবেন, কেউ বেজার হবেন। কেউ অসময়ে দরজা খোলার কারণে মনে মনে নির্বাচনের পিন্ডি চটকাবেন কিন্তু আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে মনের কথা ঢেকে রাখবেন। এমনসব বৈচিত্র নিয়েই সামনের কয়েকটি দিন বাংলাদেশ ভীষণভাবে প্রাণময় হয়ে থাকবে। এর মাঝে সাধারণ মানুষের মনে একটি স্বপ্নই অঙ্কুরিত হবে, সেটি হলো ৩০ ডিসেম্বর একটি ভাল নির্বাচন হোক। একজন ভাল মানুষ জনপ্রতিনিধি রূপে নির্বাচিত হোন। ফলাফলে জনরায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটুক। এই স্বপ্নের মাঝে আশংকার কুয়াশাও চাদর বিছাবে। সেখানে ফোটা ফোটা জলের মত উদ্বেগের তরল জমতে থাকবে। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখন উৎসবমুখরতার চরিত্র পালটে সহিংস সংঘাতময় হয়ে উঠে সেই ভয় তাড়িত করবে ঠিক কনকনে উত্তরে বাতাসের মত। এরপরও দিন যাবে, আসবে ৩০ ডিসেম্বরের রাঙা প্রভাত। সেই দিনটিকে ঘিরেই এত আবেগ, এত উত্তেজনা, এত অজানা শঙ্কা, এত স্বপ্নে ঘুড়ি উড়ানো। একটি নির্বাচন যখন এত এত আয়োজন গায়ে চড়িয়ে হাজির হয় মানুষের আঙ্গিনায় তখন তার তাৎপর্য অস্বীকার করে এমন শক্তি কার?
নির্বাচনের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন, আধুনিক গণতন্ত্রের এমনতর ধারণাটি সাম্প্রতিককালে সাংঘাতিকভাবে চ্যালেঞ্জে পড়েছে। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চরম গণবিমুখতা ও আত্মমুখী ভোগসর্বস্ব প্রবণতা নির্বাচকম-লীকে হতাশ করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থাটিকে বহু প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সুপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার গণআকাক্সক্ষা বারবার হুছট খাচ্ছে। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবন- এমন বৈশিষ্ট্যব্যঞ্জনায় গণতন্ত্র আজ সংকটাপন্ন। আসন্ন নির্বাচনটি এমন প্রেক্ষাপটকে অস্বীকার করে নতুন তাল-লয়-সুরের ইন্দ্রজাল গড়ে তুলবে তেমনটি অবাস্তব কল্পনা হলেও মানুষ বরাবরের মত এবারও সেই কল্পনার সুতোই আকাশে ছেড়েছে। আকাশ তো বিশাল এবং উদার। বিশালের মাঝে ক্ষুদ্রতা হারিয়ে যদি মানুষের স্বপ্ন-কল্পনার ফুল ফুটে তবে বেঁচে যায় গণতন্ত্র।