নির্বিচারে বৃক্ষ কর্তনকারীদের শাস্তি হবে কি ?

একটি হাওরের সরকারি জায়গা থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে নেয়া দুর্বিনীত অপরাধবৃত্তির নমুনা। জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরের সুন্দরপুর জলমহাল ও কালীবাড়ি খালের দুই পাশে লাগানো করস গাছগুলো গত কয়েকদিন যাবৎ স্থানীয় কয়েক গ্রামের লোকজন গণহারে কেটে নিচ্ছেন বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়। স্থানীয় ইউপি মেম্বার গাছ কাটায় বাধা দিলেও তাতে কর্ণপাত করছেন না কর্তনকারীরা। গণহারে এই গাছ কর্তনের ফলে সরকারি সম্পদ লোপাটের পাশাপাশি হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হাওরে লাগানো হিজল-করস জাতীয় গাছগুলো নানাভাবে হাওর প্রকৃতিকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। একদিকে এই গাছগুলো হাওরে আসা অতিথি পাখিসহ সকল প্রজাতির পাখির আশ্রয়স্থল হিসাবে কাজ করে। গাছগুলো হাওর তীরবর্তী গ্রামগুলোকে বিশাল ঢেউয়ের আঘাত থেকে রক্ষা করে। এই গাছগুলো মাছের আবাসস্থল হিসাবেও কাজ করে থাকে। গাছের ডালপালা কেটে বিল-জলাশয়ে ফেলে মাছের আশ্রয়স্থল গড়া হয়। হিজল-করস জাতীয় গাছগুলো হাওর প্রকৃতিকে অনন্য সুষমাম-িত করে রেখেছে যার কারণে প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে এই জেলার হাওরগুলো। এরকম পরিবেশবান্ধব করস গাছগুলো নির্বিচারে যারা কেটে নিচ্ছেন তারা শুধু অপরাধীই নন এরা প্রকৃতি-হন্তারকও বটে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।
হালির হাওরে নির্বিচারে বৃক্ষ কর্তনের এই মহোৎসব সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন কোনকিছুই অবহিত নন বলে জানিয়েছেন জামালগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার। একটি বিশাল হাওরে কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে প্রকৃতিবান্ধব গাছগুলো কেটে নেয়া হয় অথচ কেউ এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন না, এ এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা বটে। এই ধরনের নির্লিপ্ততা যেকোন জাতিকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। উন্মুক্ত স্থানে গণসম্পত্তির পাহারাদারির দায়িত্ব জনতাকেই প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করতে হয়। জনগণ যদি নিজেদের সম্পদ পাহারা না দেন তাহলে নগণ্য সংখ্যক সরকারি পুলিশ বা প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ কিছুতেই এই সম্পদ রক্ষা করতে পারবেন না। তবে গণপাহারাদারির পরিবেশের জন্য যে ধরনের জাতীয় সংস্কৃতির প্রয়োজন হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটি নেই বললেই চলে। কারণ নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো করে কেউ যদি প্রতিবাদী হন তখন তাকে যে পরিমাণ প্রত্যাঘাত সহ্য করতে হবে সেখান থেকে তাকে রক্ষা করতে সাধারণত এখন এগিয়ে আসার মত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নেই। তাই চোখের সামনে অনিয়ম হতে দেখলেও সাধারণ মানুষ চোখ বন্ধ করে রাখেন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদে গাছ কর্তনের সাথে জড়িত কিছু ব্যক্তির নাম প্রকাশ হয়েছে স্থানীয় সূত্রের ভিত্তিতে। অনুসন্ধান করলে বাকি নামগুলোও বের করে আনা অসম্ভব কিছু নয়। প্রশাসন যদি চিহ্নিত এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তাহলে এই ধরনের অপরাধ কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করার বাস্তবতা তৈরি হয়। সেরকম কিছু হবে কি? উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসক গাছ কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। আমরা জানি না দীর্ঘসূত্রিতা, জটিলতা, অনান্তরিকতা ইত্যাদি কাটিয়ে নির্বিচারে বৃক্ষ কর্তনকারীরা কখন কী ধরনের শাস্তি পাবেন। তবে এদের শাস্তি দেয়া না হলে সুনামগঞ্জের কোন হাওরেই কোন গাছ থাকবে না, এটি ধ্রুব সত্য।