নির্মাণ শেষ হয়নি ৯ বছরে বিল উত্তোলন হয়েছে

বিন্দু তালুকদার
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতিটা ইউনিয়নে একটি করে ‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র’ থাকার কথা।
সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নে ‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র’ (এইচ এন্ড এফডøাবিওসি) নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ৯ বছর আগে।
২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। ভবনের অর্ধেক কাজ হলেও গত ৯ বছরেও শেষ হয়নি। কিন্তু ঠিকাদার অধিকাংশ বিল উত্তোলন করে নিয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সিলেট স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে বার বার চিঠি লিখেও কোন সদুত্তর পায়নি জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর।
ফলে নির্মাণাধীন দুই তলা বিশিষ্ট ভবনটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পরিত্যক্ত ভবনে অস্থায়ীভাবে খড়-ধান মওজুদ করে রাখেন স্থানীয় কৃষকরা। ভবনের ছাদে অনেকেই ভেজা ধান শুকান। ভবন নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হওয়া ও কেন্দ্রটি চালু না হওয়ায় সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন ইউনিয়নবাসী। যদিও ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে স্বাস্থ্য সেবা দেন একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ভবন ৬০ লাখ টাকা করে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকায় তিনটি ‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র’ নির্মাণের কাজ পায় সিলেটের ‘মেসার্স নর্থ সুরমা কন্সট্রাকশন’ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তিনটি ভবনের মধ্যে একটি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, একটি সিলেটের গোয়াইনঘাট ও অন্যটি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবাননগরে। কমলগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সুনামগঞ্জের কাজ ফেলে রেখে দিয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, অর্ধেক কাজ করার পর কাজ ফেলে ঠিকাদার চলে গেছেন। এখন পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটির ক্ষতি হচ্ছে। এদিকে ঠিকাদার নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি প্রায় ৬০ ভাগ কাজ করেছেন। ৬০ লাখ টাকার বরাদ্দের মধ্যে ২৬ লাখ ছাড়া বাকী টাকার বিল উত্তোলন করেছেন তিনি।
সম্প্রতি নির্মাণাধীন পরিত্যক্ত ভবনটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (সিসি) ডা: ননী ভূষণ তালুকদার, সুনামগঞ্জ সদর এমও (এমসিএইচ-এফপি) ডা. দেবাশীষ শর্মা এবং সদরের এইউএফপিও রনেন্দ্র চক্রবর্তী।
কুরবাননগর ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মইন উদ্দিন বলেন,‘ নির্মাণাধীন ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে ইউনিয়নবাসী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে । ’
ব্রাহ্মণগাঁও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন,‘ অনেক বছর ধরে এই ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। কেন এই ভবনের কাজ বন্ধ আছে, বিষয়টি স্থানীয় কেউ জানেন না। ’
কুরবাননগর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বরকত বলেন,‘ গত ৭ বছর ধরেই দেখছি এই ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ। কেন কাজ বন্ধ হয়ে আছে বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ সঠিক কিছু বলতে পারেন নি। কাজ বন্ধ থাকায় মানুষ চরম ক্ষুদ্ধ। এটা চালু হলে আমার ইউনিয়নবাসীর বিরাট উপকার হত। আমরা দাবি জানাই কাজ শেষ করে দ্রুত চালু করা হোক। ’
জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (সিসি) ডা. ননী ভূষণ তালুকদার বলেন,‘ভবনটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। যতটুকু জেনেছি ভবন নির্মাণকারী ঠিকাদার নাকি কাজ শেষ না করেই চলে গেছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হবে।’
জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মোজাম্মেল হক বলেন,‘ এই ভবন নির্মাণ কাজ তদারকি ও বাস্তবায়ন করছেন বিভাগীয় স্বাস্থ’্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সেখান থেকেই দরপত্র আহবান ও ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ শেষ না করলেও ঠিকাদারকে বিল প্রদান করায় ঠিকাদার অসমাপ্ত ভবন ফেলে চলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি অন্তত ১১ বার বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি লিখেছি কিন্তু কোন কর্ণপাত করছেন না তারা। এই কেন্দ্র চালু না হওয়ায় এলাকার মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন। ’
সিলেটের বিভাগীয় স্বাস্থ’্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারি প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন,‘সুনামগঞ্জের ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাদের সম্পূর্ণ বিল দেয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। জামানত ছাড়াও প্যাকেজের বরাদ্দ ছাড় দেয়া হয়নি। ঠিকাদার আগামী ১০ দিনের মধ্যে কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন। যদি কাজ শেষ না করেন তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ’
ঠিকাদার আজিজুর রহমান বলেন,‘ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ নানা কারণে ভবনের কাজ শেষ করতে পারি নি। একই প্যাকেজে তিনটি ভবনের কাজ ছিল। অন্য দুইটির কাজ শেষ করে ভবন হস্তান্তর করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের ভবনের প্রায় ৬০ ভাগ কাজ করেছি। ৩৪ লাখ টাকার বিল পেয়েছি। আমার কারণে এলাকার মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন এটা সঠিক। আগামী ১০ দিনের মধ্যে ভবনের কাজ শুরু করব।’