নিলামমূল্য আটগুণ বেড়ে যাওয়া

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে জনস্বার্থ কতটা রক্ষিত হতে পারে তার একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে গতকালকের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একটি সংবাদে। শেষ পৃষ্ঠায় পরিবেশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দুই প্রাথমিক বিদ্যালয় যথা- দামোধরতগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরাতন দুই ভবন প্রকাশ্য নিলামে যথাক্রমে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং ৪১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ এর আগে গত ১৩ আগস্ট ওই বিদ্যালয় ভবন দুইটি গোপন সমঝোতার নিলামে যথাক্রমে ১৪ হাজার ও ১৬ হাজার ৬ শত টাকায় বিক্রি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। তখন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয় যেখানে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সাথে নিলামকারীদের গোপন সমঝোতার বিষয় উল্লেখ এবং স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল এই ভবন দুইটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা হলে আরও বেশি অর্থ সরকারি কোষাগারে দেয়া সম্ভব। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় গোপন সমঝোতার বিষয়টি ভেস্তে যায় এবং কর্তৃপক্ষ আগের নিলাম ডাক বাতিল করতে বাধ্য হন। ঠিক এক মাসের মাথায় প্রকাশ্য নিলামে বিদ্যালয় দুইটি আগের নিলাম ডাকের চাইতে যথাক্রমে আট গুণ ও তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের যথার্থতা প্রমাণ করেছে। একই সাথে সরকারি সম্পদ নিয়ে এর রক্ষকরা কত ধরনের অপকর্ম করতে পারেন তার স্বরূপ বেরিয়ে এসেছে। এই দুই বিদ্যালয়ের বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে বলে হয়ত কিছুটা জনস্বার্থ রক্ষা করা গেছে, কিন্তু গণমাধ্যমের অগোচরে এমন কত হাজার লক্ষ ঘটনা ঘটে চলেছে তার হিসাব মিলানো সত্যিকার অর্থেই কঠিন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে লাইন ডিপার্টমেন্টের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপিত আছে। উপরের স্তরের কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত অধস্তন দপ্তরসমূহ পরিদর্শন করে থাকেন। রয়েছে পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা। এতসব তদারকি, নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা চালুর মূল উদ্দেশ্য হল, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনস্বার্থে পরিচালিত করা এবং নিজেদের অন্তর্গত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? দেখছি,সর্বস্তরে অন্তহীন এক অনিয়ম-দুর্নীতির মহোৎসব। তাহলে এইসব তদারকি, নিয়ন্ত্রণ বা পরিবীক্ষণের কার্যকারিতা কোথায়? প্রশ্নটির উত্তর মেলানো খুব কঠিন।
তবে এ কথা সত্য, কর্তৃপক্ষ সদিচ্ছা পোষণ করলে কিছু করতে পারেন। এটি আমরা দেখেছি গত মৌসুমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময়। আগের বছরগুলোতে যখন বাঁধ নির্মাণ/রক্ষণাবেক্ষণের নামে আসা বরাদ্দ লুটপাটের মহোৎসব চলত সেখানে গত মৌসুমে ্এ নিয়ে তেমন কোন বড় ধরনের অভিযোগ শোনা যায় নি। কাজের মানও আগের যেকোন সময়ে চাইতে অনেক অনেক বেশি ভাল হয়েছে। এই ভাল হওয়ার পিছনে যেসব কারণ ছিল, সেগুলো হলোÑ তীব্র গণজাগরণ, গণতদারকি, প্রশাসনিক তদারকি ও আন্তরিকতা এবং পিআইসির দক্ষতা। এই বাঁধ নির্মাণের দৃষ্টান্তটি কাজে লাগালে আমাদের উন্নয়ন কর্মকা-ের গুণগত মান অনেক বর্ধিত হত, কমে যেত দুর্নীতি নামক দুষ্ট দানবীয় আগ্রাসন।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে যেখানে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন বিক্রির দুর্নীতি শুরুতে আটকানো যায়নি সেখানে বড় দুর্নীতিগুলো আটকানো কঠিন বৈকি। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য দরকার দৃঢ় অঙ্গীকার ও জাতীয় চেতনার জাগরণ। আমরা সেই জাগরণের অপেক্ষায়ই আছি।