নেই সন্তোষজনক অগ্রগতি

বিশ্বজিত রায়, শনি, হালি ও মহালিয়া ঘুরে এসে
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। কাজের সময়সীমা প্রায় শেষের দিকে অবস্থান করলেও কোন কাজই শেষ হয়নি। হাতেগোণা কয়টি বাঁধে কেবল মাটি ফেলা শেষ হয়েছে। তবে দুরমুশ, মাটি ড্রেসিং ও দুর্বা ঘাস লাগানোর কাজ প্রায় সবক’টি বাঁধেই বাকি রয়ে গেছে। এছাড়া কোনো কোনো বাঁধে মাটি ফেলা কেবল শুরু হয়েছে, আবার কোনো বাঁধে মাটির কাজ অর্ধেক শেষ হয়েছে। আবার কোনো বাঁধে মাঝে-মধ্যে সামান্য মাটি ফেলে কাজের চলমান গতি বোঝানোর ভ্রান্ত চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ নিয়ে সঠিক সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাঁধ রক্ষা কাজের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছেন হাওর পাড়ের সাধারণ মানুষ। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দিনব্যাপী হালি, শনি ও মহালিয়া ঘুরে এমন বাস্তবতা চোখে পড়েছে।
এছাড়া খবর নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ আরেক হাওর পাগনার অবস্থাও প্রায় একই রকম। এখানে কয়েকটিতে মাটি ফেলার কাজ শেষ হলেও বাকিটিতে মাটি ফেলা শুরু কিংবা অর্ধেক শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি রয়ে গেছে আনুষাঙ্গিক সব কাজ। কাজ পেছানোর কারণ হিসেবে ভেকো মেশিন নষ্ট বলে জানিয়েছেন পিআইসি সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ওইদিন (১৮ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ আসার খবরে লালুর গোয়ালা, ঝালোখালিসহ বেশ কয়েকটি বাঁধে পিআইসি সংশ্লিষ্ট ও শ্রমিকেরা দল বেঁধে কাজ করছেন। কাজের তোড়জোর দেখে বোঝার উপায় নেই গেল সপ্তাহ-দশদিন আগেও পিআইসিশূন্য ছিল এ বাঁধগুলো। যে বাঁধে গিয়ে কাউকে খোঁজে পাওয়া যায়নি সে বাঁধও এখন কর্মমুখর।
এ ব্যাপারে বাঁধের নিকটবর্তী গ্রামের কৃষকেরা জানিয়েছেন, ‘স্যার আইতাছইন তাই কাজের এত গতি। এ রকম কাজ যদি হইত তাহইলে সময়ের আগেই সম্পূর্ণ কাজ শেষ হইয়া যাইত। কালকে আইলেই দেখতে পাইবেন কাজের গতি আবার থাইম্মা গেছে। পরেরদিন এরারে বান্ধ পাওয়া যাইব কি না সন্দেহ আছে।’
নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাঁধের বাস্তব পরিস্থিতি দেখে আরও ১৫ দিন সময় বাড়িয়ে দিলেও কাজ শেষ হবে কি না সন্দেহ রয়েছে। হাওর পাড়ের মানুষের সাথে কথা বলে এমনটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বাঁধ নিয়ে হালি পাড়স্থ আছানপুর গ্রামের কয়েকজনের সাথে কথা বললে, তাদের মধ্যে একজন (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলে উঠেন, ‘আটাশ তারিখ, আরে আরও কত আটাশ তারিখ যাইব। এরপরও শেষ হইলেই হয়।’ একই গ্রামের ফারুক হোসেন বলেন, ‘কাজ শেষ হইতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম হইলেও আরও ১৫-২০ দিন লাগব। একটার কাজ শেষ না হইতেই এইডার ভেকো অন্যডায় লইয়া যায়, তাহইলে শেষ হইব কি কইরা।’
শনির হাওরের বিপজ্জনক ক্লোজার লালুর গোয়ালায় গিয়ে দেখা যায়, ক্লোজারে মাটি ফেলার কাজ এখনও চলছে। গত প্রায় ১৫ দিন আগে বাঁধ পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গিয়েছিল, ক্লোজারের একাংশে সামান্য মাটি ফেলা এবং বাঁধসংলগ্ন গর্ত ভরাটে ড্রেজার লাগানো হয়েছে। দুই সপ্তাহ পরে এসে পাশের বিপজ্জনক গর্তটির একাংশ ভরাট করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর এতদিনে বাঁধের কাজ পুরোদস্তুর সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাঁধে এখনও মাটি ফেলার কাজই শেষ করা হয়নি। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এ বাঁধে নির্ধারিত সময়ের আগে পুরো কাজ শেষ হবে কি না তাতে সন্দেহ প্রকাশ করছেন স্থানীয় কৃষক।
এ নিয়ে বাঁধে কর্মরত ৭ ও ৮নং পিআইসির সভাপতিদ্বয়কে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, ‘তিন-চারদিনের মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।’ গর্তে মাটি ফেলা এখনও অর্ধেক বাকি আছে, তাহলে চারদিনে কিভাবে শেষ করবেন, পাল্টা প্রশ্নের জবাবে তারা সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
হালির আরেক বিপজ্জনক ক্লোজার (৬০নং পিআইসি) মদনাকান্দি ভাঙ্গাটি শুধু মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। মদনাকান্দি পর্যন্ত বাঁধের অপর অংশে কোনরকম মাটি ফেলা হয়নি। মেইন ক্লোজারে মাটি ছাড়া অপর অংশটি অরক্ষিতই রয়ে গেছে। এছাড়া হাওরের আরেক ঝুঁকিপূর্ণ ডাকাতখালি বাঁধের (৪৯ ও ৫০নং পিআইসি) বেশকিছু অংশে এখনও মাটি ফেলা হয়নি। এর মাঝখানে একটু মাটি ফেলে জানান দেওয়া হয়েছে কাজ চলছে।
মহালিয়া হাওরে গিয়ে দেখা যায়, ৫টি বাঁধের মধ্যে মাত্র ১টিতে মাটি ফেলা সম্পন্ন হয়েছে। বাকিটিতে মাটির কাজ চলছে। কোনটিতে অর্ধেক কোনটিতে শুরু। সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসলেও বাকি আছে আনুষাঙ্গিক সব কাজ। নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন মহালিয়া পাড়ের কৃষকরা।
হিজলা ও নওয়াপাড়া মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ১৬নং পিআইসি নিয়ে নওয়াপাড়া গ্রামের ভূষণ সরকার বলেন, ‘এই বাঁন্ধে ট্রাক যাওয়ার কথা বলে পুরাতন বস্তি মাটি কাইটা বাঁধকে আরও গভীর করা হইছে। এখন এই বাঁন্ধেই হালকা মাটি দিয়া কাজ শেষ করা হইব। বাঁন্ধে এই রকম কাজই চলছে আর কি।’
হিজলা গ্রামের অনুকূল বর্মণ জানিয়েছেন, ‘গতবারের তুলনায় এ বছর দুর্বল কাজ হইছে। এবার এ বাঁধটা যতটুকু উঁচা করা হইছে, গতবার এর চেয়ে বেশি উঁচা ছিল। আরও দশদিন আগ থাইক্কাই এইখানে মাটি ফেলা হইছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমপেকসন স্লোব কিছুই হইতাছে না।’
পৈন্ডুপ গ্রামের কৃষক প্রবোধ সরকার জানিয়েছেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন কাজই শেষ হবে না। আরও ১৫ দিন বাড়িয়ে দিলেও কাজ শেষ হবে বলে মনে হয় না।’
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, ‘নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। হালি হাওরের ২৮টি বাঁধের মধ্যে ১৩টি বাঁধে কোনরকম মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। অন্য সব কাজ বাকি আছে। আর বাকি বাঁধের কোনটিতে মাটি ফেলা শুরু হয়েছে, কোনটিতে অর্ধেক। এছাড়া পাগনার ২০টির মধ্যে ৫টির কাজ মোটামোটি সন্তোষজনক। বাকিগুলোর অবস্থা উদ্বেগজনক। কোন বাঁধেই নীতিমালা মানা হয়নি।’
এ ব্যাপারে কাবিটা স্কীম বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘বাঁধে আমাদের মনিটরিং টিম নিয়মিত কাজ করছে। দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করতে জোর তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে কেউ ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’