নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খনি

বিশেষ প্রতিনিধি
তারা বৃক্ষপ্রেমিক। নিজেরা উদ্যোগি হয়ে হিজল-খরচ বাগ করেছেন। এই বাগগুলো এখন পাহারাও তারাই দিচ্ছেন। এখানে গাছের ডাল কাটলে বা ভাঙলে গ্রামবাসীর আইন ৫০০ টাকা জরিমানা, এমন অপকর্ম কেউ দেখে লুকিয়ে রাখলে তারও ৫০০ টাকা জরিমানা। ভাটি অঞ্চলের জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের পাগনার হাওরে গেলে তিনটি হিজল খরচ বাগ দেখলে যে কারও মন জুড়িয়ে যাবে। এই বাগগুলো এখন ভাটির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খনি হিসেবে বিবেচিত হয়। এলাকাবাসী জানালেন, ২০ বছর আগে উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস পাগনার হাওরের কানাইখালী নদীর পাড়ে বিনাজুরা, ভাটি দৌলতপুর, খামারগাঁও ও ছয়হারা এবং ফেনারবাঁক গ্রামের পাশে নলচুন্নিবাগ, নবীনচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে মাতারগাঁও-খোঁজারগাঁও গ্রামের বাসিন্দাদের দিয়ে সমিতি করে হিজল-খরচ’এর বাগ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস’এর কোন কাজ এখন আর জামালগঞ্জে নেই। কিন্তু হিজল-খরচ বাগগুলেকে আগলে রেখেছেন গ্রামবাসী।
স্থানীয় ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু তালুকদার জানালেন, গাছ লাগানোর পর গ্রামের মানুষকে দিয়েই উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস ৩-৪ বছর দেখাশুনা করেছে। এরপর থেকে গ্রামবাসী নিজেরাই এই বাগ রক্ষা করছেন। হিজল-করচ বাগ যেসব এলাকায় গড়ে ওঠেছে, এরমধ্যে খোজারগাঁও, মাতারগাঁও, ছয়হারা এলাকার জমি এলাকাবাসী’র যৌথ রেকর্ডে বা তালুকি জমিতে হয়েছে। বিনাজুরা, ভাটি দৌলতপুর এবং খামারগাঁও’এর জমি জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানভুক্ত। রাজাপুরের জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসকের খাস খতিয়ানভুক্ত জমিতে হওয়া হিজল-করচ বাগ’এর বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসককে সম্প্রতি অবহিত করা হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু তালুকদার জানালেন, বাগের পাশের গ্রামবাসী যৌথ উদ্যোগেই এখন বাগ রক্ষা করছেন। হিজল-করচ বাগে একটি ডালও কেউ কাটতে পারে না। কাটলে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করেন। কয়েক বছর আগে ঝড়তুফানে বাগের একটি ডাল হেলে চলাচলের পথে পড়েছিল। একজন এই ডাল কেটেছিল। মাতারগাঁও গ্রামবাসী যে ডাল কেটেছে তার উপর মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে এলাকার গণ্যমান্যগণ বসে এটি মিমাংসায় সমাধান করেছেন।
বিনাজুরা গ্রামের বৃক্ষপ্রেমিক অনিল পুরকায়স্থ এক সময় উন্নয়ন সংগঠন সিএনআরএস’এ কমিউনিটি অফিসার হিসাবে কাজ করতেন। তিনি বললেন, ২০ বছর আগে লাগানো হিজল-করচ বাগ এখন এলাকার সৌন্দর্য যেমন বাড়িয়েছে তেমিন বৃক্ষের ছায়া প্রাণ জুড়ায় সকলের। বর্ষায় এই বাগগুলো মাছের অভয়াশ্রম হয়। এলাকাবাসী শুরুতেই মুখে মুখে আইন করেছিলেন বাগের গাছ বা ডাল নষ্ট করলে ৫০০ টাকা, নষ্ট করার সময় কেউ দেখে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ বা গ্রাম পঞ্চায়েতকে না জানালেও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হবে। এখন সবাই হিজল-করচ বাগকে নিজেদের মনে করেন।
তিনি বলেন, এলাকাবাসী এতোটা আন্তরিক থাকলেও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমিতে থাকা হিজল-করচ বাগ’এর উপর কোন সময় কার লোলুপ দৃষ্টি পড়ে এই নিয়ে এলাকাবাসী’র দুশ্চিন্তাও রয়েছেন।
এলাকার বাসিন্দা সাবেক ছাত্রনেতা শাহরিয়ার বিপ্লব বললেন, কানাইখালী নদীর পাড়ের হিজল করচ বাগের পাশে গেলে মন জুড়িয়ে যায়। আমি গর্ববোধ করি এই জন্য যে এই বাগ গড়ে তুলেছেন আমার এলাকার সাধারণ মানুষ। আমরা তাদেরই সন্তান।