নৌকার মাঝি হতে চান বেশিরভাগই

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রার্থী ও সমর্থক ছাড়াও সাধারণ মানুষের মাঝে নির্বাচনী হাওয়া পুরোদমে বইতে শুরু করেছে। তৃতীয় ধাপের তপসিল ঘোষণার পর থেকে সাধারণ ভোটারদের মাঝে বাড়তি উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে। চতুর্থ ধাপে এই উপজেলার নির্বাচনের সম্ভাবনা মাথায় রেখে হাট-বাজার ও পাড়া-মহল্লাসহ সবখানেই নির্বাচনী আলোচনা শুরু হয়েছে। চলছে আঞ্চলিক ও দলীয় ভোটের হিসাব-নিকাশও।
ভোটারদের জানান দিতে ৬ ইউনিয়নের অর্ধশত সম্ভাব্য প্রার্থী নিজ নিজ ইউনিয়নের গ্রামগুলো চষে বেড়াচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অধিকাংশই সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। কেউ কেউ ড্যামি প্রার্থীও রয়েছেন। নৌকার সমর্থন পেতে তদবিরে মরিয়া অনেকে। দলীয় প্রতীক পেলে নির্বাচন করবেন, না পেলেও নির্বাচনে লড়বেন- এমন গণসম্পৃক্ত প্রার্থীও আছেন।
বিএনপি নির্বাচনে না আসায় বিএনপি ঘরানার প্রার্থীদের আওয়াজ কম। দলীয় প্রতীকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে শক্তিশালী কিছু প্রার্থী নিজ দায়িত্বে স্বতন্ত্র লড়বেন। এই প্রার্থীদের সঙ্গেই সরকার দলীয়দের লড়াই জমবে। বিএনপি নির্বাচনে আসছে না ভেবে, আওয়ামী লীগের যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হলে স্বতন্ত্র বিএনপির কাছে ভরাডুবি হবে নৌকার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামালগঞ্জের এক নম্বর বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার, সুব্রত সামন্ত সরকার, মো. সারোয়ার হোসেন, ভজন তালুকদার, মকসুদ আলম, অজিত রায় ও ফয়েজ আহমদ হাবলু। এছাড়া প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের ছেলে মো. আমিনুল হক মনি শুরু থেকে মাঠ চষে বেড়ালেও এখন তিনি নিস্প্রভ।
বেহেলী ইউনিয়নের অধিকাংশ সম্ভাব্য প্রার্থীই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বাগাতে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এই দৌঁড়ে যাদের নাম বেশি আলোচনায়, এরা হচ্ছেন- সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক সুব্রত সামন্ত সরকার, বেহেলী ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সারোয়ার হোসেন, গেল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ভজন তালুকদার, ইউপি সদস্য অজিত রায় ও ফয়েজ আহমদ।
দুই নম্বর জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে প্রার্থীর সংখ্যা ৯ জন। নির্বাচনী আলোচনায় থাকা এসব সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক জামিল আহমেদ জুয়েল, ৭১ শহীদ স্মৃতি ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবুল কালাম সরকার, আবুল খয়ের, ফয়জুল ইসলাম মোহন, মতিউর রহমান মতি, ফয়সল আহমেদ চৌধুরী, উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ।
এখানকার সম্ভাব্য প্রার্থীর বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। দলীয় মনোনয়নের উপরই প্রার্থীতা নির্ভর করছে অনেকের। গেল ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জামিল আহমেদ জুয়েল ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলীর মধ্যে যে কেউ নৌকার মাঝি হতে পারেন, এমন ধারণা সাধারণ ভোটারের।
তিন নম্বর ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পাগনার হাওরবেষ্টিত। এ ইউনিয়নে ৯ জন নির্বাচনী লড়াই করতে আগ্রহী। এরা হলেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জীতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু, জেলা কৃষক লীগের সদস্য সচিব বিন্দু তালুকদার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক আহবায়ক আব্দুল লতিফ নাজেল, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বাবলু, জুলফিকার চৌধুরী রানা, সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, সুব্রত পুরকায়স্থ, ইউপি সদস্য আসাদ আলী ও নূরু মিয়া।
ইউনিয়নের সাত বারের ইউপি চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু তালুকদার বার্ধক্যজনিত কারণে নির্বাচনে প্রার্থী হতে অপারগতা জানিয়েছেন দলীয় নেতা ও সমর্থকদের। মঙ্গলবার উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায়ও তিনি প্রার্থী হতে নিজের অপারগতার কথা জানান। দলীয় মনোননয়ন না পেলে নির্বাচন করবেন না জেলা কৃষকলীগের সদস্য সচিব সাংবাদিক বিন্দু তালুকদার। সাবেক ছাত্রনেতা জীতেন্দ্র তালুকদার পিন্টু, মতিউর রহমান, আব্দুল লতিফ নাজেল ও সুব্রত পুরকায়স্থ আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য দৌঁড়ঝাঁপে আছেন।
চার নম্বর সাচনা বাজার ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থী ৫ জন। এর মাঝে উপজেলা আওয়ালীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এহসানুল করিম পারভেজ, মো. মাসুক মিয়া, সাবেক ছাত্রনেতা নাছিরুল হক আফিন্দী, মিছবাহ উদ্দিন রুমী, সায়েম পাঠানের নাম রয়েছে। এদের মধ্যে মো. মাসুক ও মিছবাহ উদ্দিন ছাড়া বাকি তিনজনই আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী।
পাঁচ নম্বর ভীমখালী ইউনিয়নে ৬ জন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মো. দুলাল মিয়া, উপজেলা আ.লীগের আইন সম্পাদক অ্যাড. মো. আব্দুল খালেক, ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি মো. আক্তারুজ্জামান শাহ, অ্যাড. শাহীনুর রহমান, ব্যবসায়ী মো. আজিজুর রহমান ও সাংবাদিক আক্তারুজ্জামান তালুকদার।
ছয় নম্বর জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রজব আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন, সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম, বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান, মুবারক আলী তালুকদার, উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি শাহানা আল আজাদ, ইউপি সদস্য মো. হানিফ মিয়া ও তরুণ সমাজসেবী সৈকত ঘোষ চৌধুরীসহ ৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থী সক্রিয় রয়েছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের বেশিরভাগই মনোনয়ন না পেলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন।
উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৬ ইউনিয়নে মোট ভোটার ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৪ জন।
এর মধ্যে বেহেলী ইউনিয়নে ১৩ হাজার ৯২৯ জন, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নে ২০ হাজার ১৩২ জন, ফেনারবাঁক ইউনিয়নে ২৫ হাজার ৪২২ জন, সাচনা বাজার ইউনিয়নে ১৭ হাজার ৯৬৮ জন, ভীমখালী ইউনিয়নে ২৩ হাজার ২২১ জন, জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৩৮২ জন ভোটার রয়েছেন।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, চতুর্থ ধাপে জামালগঞ্জের নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে যেহেতু ২ টি করে উপজেলার নির্বাচন দেওয়া হয়েছে, সেহেতু চতুর্থ ধাপে জগন্নাথপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের নির্বাচন হতে পারে। একইসঙ্গে জামালগঞ্জের নির্বাচনও হতে পারে। না হলে নির্বাচন পরের ধাপে চলে যাবে জামালগঞ্জের নির্বাচন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কমিশনের বৈঠকে হয়তো চতুর্থ ধাপের নির্বাচন বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।