নয়নের বন্ড হয়ে উঠা ও আমাদের বীর পূজার মানসিকতা

বরগুনা জেলা সদরে স্ত্রীর সামনে স্বামী তরুণ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে মঙ্গলবার ভোর রাতে নিহত হয়েছে। নয়ন বন্ডের আসল নাম সাব্বির আহমদ। ডাক নাম নয়ন। কিন্তু নামের শেষে ‘বন্ড’ উপাধিটি পরে যুক্ত হয়েছে সম্ভবত তার গুণমুগ্ধদের বদান্যতায়। সে বরগুনা শহরের অপরাধ কর্মকা-ের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। সাম্প্রতিক সমাজে অপরাধীদের সামাজিক কৌলীন্য অনেক বেড়ে গেছে। যে যত বড় সন্ত্রাসী কিংবা অপরাধী সমাজে তার কদর তত বেশি। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বড় একটি অনুসারী গোষ্ঠী। আমাদের চারপাশে যেসব সন্ত্রাসী-অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের দিকে তাকালে এই নিদারুণ সত্য অনুভব করা যায়। সাব্বির আহমদ নয়নকে কেন্দ্র করেও এমন একটি অনুসারী গোষ্ঠী আছে। তারাই সম্ভবত তাকে ‘বন্ড’ উপাধিতে সম্মানিত করেছে। নয়নের নামের শেষের বন্ড উপাধিটি নেয়া হয়েছে জেমস বন্ড নামক চরিত্রের অনুকরণে। বিখ্যাত ইলিশ ঔপন্যাসিক ইয়ান ফ্লেমিংয়ের উপন্যাসের চরিত্রের নাম জেমস বন্ড। এই জেমস বন্ড ব্রিটিশ ইন্টিলিজেন্ট সার্ভিসের গুপ্তচর হিসাবে অপরাধীদের দাপিয়ে বেড়াত। ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড ছিল অপরাধ ও অপরাধীর জন্য যমদূত স্বরূপ। কিন্তু নয়ন বন্ড কি তাই? সে তো এক ভয়ানক অপরাধী। তার দাপটের কাছে অসহায় ছিল বরগুনার মানুষ। সুতরাং বন্ড উপাধি ধারণ করে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিতে আচ্ছন্ন থাকলেও আসলে সে ভয়াল-ভয়ংকর ড্রাকুলা। তার নাম বরং নয়ন ড্রাকুলা হলেই মানাত বেশি। কিন্তু ওই যে বললাম, আমাদের সামজ মানসে বীর পূজার পরম্পরা, সেখান থেকেই নয়ন অবলীলায় নামের শেষে বন্ড ধারণ করতে পেরেছে। এই বীরপূজার মানসিকতা যতদিন আছে ততদিন আমাদের নিষ্কৃতি নেই।
কথিত বন্দুক যুদ্ধে নয়নের মৃত্যুর পর দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। একেবারে সাধারণ মানুষ যারা, তারা এতে ভীষণ খুশি। মঙ্গলবার সকালে অনেকেই ফেসবুকে নয়নের মৃতদেহের ছবিসহ সুপ্রভাত জানিয়ে পোস্ট আপলোড করেছেন। অন্যদিকে যারা একটু বুঝেন, তারা এই বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ে মোটেই প্রীত হতে পারেননি। নয়নের ক্রসফায়ারকে তারা সমর্থন করেননি। এর বাইরে তৃতীয় আরেকটি বক্তব্যের দেখা মিলেছে। সেটি হলো নয়নের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি এতে করে আড়ালে চলে যাওয়ার সুযোগ পেল। বিচারিক ধারায় থাকলে নয়নের মুখ থেকে এদের স্বরূপ উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ ছিল বলে অভিমত তাদের। আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিলতা সুবিদিত। এখানে এজাহারে ফাঁক থাকে। তদন্তে ফাঁক থাকে। আদালতে মামলা পরিচালনায় ফাঁক থাকে। আর এর সবগুলো ধাপ খুব জটিল, সময় ক্ষেপণকারী ও প্রচুর ব্যয়সাধ্য। এর ফলে অপরাধীদের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত সাজা নিশ্চিত করা বেশ দুঃসাধ্য। চোখের সামনে সংঘটিত অপরাধ কর্মকা-ের বিচার না হতে দেখে দেখে জনসাধারণের মধ্যে বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। তাই বিচারবহির্ভূত হলেও যেকোনো অপরাধীর মৃত্যুতে সাধারণ মানুষ খুশি হয়। এইভাবে ক্রসফায়ার আমাদের দেশে মানুষের কাছে এক ধরনের বৈধতা পেয়ে গেছে। কিন্তু আদতে এই ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- কোন সভ্য রাষ্ট্রের অনুসরণীয় ব্যবস্থা হতে পারে না। মূলত বিচারিক প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকতে হবে, অতি বড় অপরাধী হলে, তারও। এজন্য আমাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার সবগুলো ধাপকে অনেক সংস্কার ও পরিশুদ্ধ করতে হবে। যতদিন এ না হয় ততদিন অপরাধীর নির্মূলে ক্রসফায়ারকেই মানুষ সমর্থন করে যাবে।
আসুন, নয়নদের, অর্থাৎ যেকোনো অপরাধীকে ঘৃণা করতে শিখি। অপরাধীকে নায়ক না বানিয়ে তাকে সমাজের পতিত হিসাবে বিবেচনা করি। এদের সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করি। এরা আসলে খলনায়ক। খলনায়কের জায়গা মাথার উপরে নয়, পায়ের নীচে।