পদ-পদবির জন্য এত হন্যে হয়ে উঠা কেন?

আওয়ামী লীগের তিন ইউনিটে গঠিতব্য কমিটিতে সভাপতি হতে আগ্রহী নেতার সংখ্যা ১৩ জন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একটি সংবাদের শিরোনাম এই। এই তিন কমিটির মধ্যে ২টি উপজেলা ও ১টি থানা অন্তর্ভূক্ত। জেলা আওয়ামী লীগ ওই তিন ইউনিটে কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়ার পরই এই নেতারা বিভিন্নভাবে তদবির শুরু করেছেন। শেষ সময়ে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে ইচ্ছুক নেতার সংখ্যা আরও বাড়তেও বাড়ে। কমিটিগুলোতে বিশেষ করে শীর্ষপদে আসতে এত লোকের আগ্রহ কেন? রাজনীতি তো কোনো পেশা নয়। অন্তত রাজনীতির ব্যাকরণ তা মানে না। ‘পেশাদার রাজনীতিক’ বলে যে শব্দ প্রচলিত আছে তা একসময়ে বামপন্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতো। কারণ বাম নেতারা রাজনীতির বাইরে আর কোনো পেশা গ্রহণ করতেন না। তাই তাঁদের ভরণপোষণের জন্য পার্টির পক্ষ থেকে যৎসামান্য মাসোহারার ব্যবস্থা করা হত। কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মত দলগুলো তো কোনো বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক দল নয়। এই দলগুলো কার্যত লিবারেল ডেমোক্রেটিক ধারার মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল। একেবারে সর্বহারা বা শ্রেণিচ্যূত হয়ে পরিবার পরিজনের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে কিংবা জীবিকার অন্য সব পথ বন্ধ করে কেউ এইসব দলে রাজনীতি করতে আসেন না। এই ধরনের মধ্যপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে একসময় প্রচুর নিবেদিত ও ত্যাগী নেতৃত্বের দেখা পাওয়া যেত। ওই নেতারা দল ও আদর্শের প্রতি ছিলেন ভীষণ অনুরক্ত। রাজনীতি করাটাকে তাঁরা জনসেবার অংশ মনে করতেন। তাঁরা নিজের ব্যক্তিগত সহায়-সম্পদ কিংবা উপার্জনের অংশবিশেষ পার্টির জন্য ব্যয় করতে কুণ্ঠিত হতেন না। কিন্তু একসময়ে রাজনীতি থেকে জনসেবার আদর্শটি ছেড়া পাতার মতো খসে পড়ল আর যাবতীয় ভোগবাদিতা ও স্বার্থপরায়ণতা এসে আদর্শের জায়গাটুকু দখল করে নিল। দেখা গেল শুধু রাজনৈতিক পদ-পদবি ব্যবহার করে বিনা পূঁজি বা শ্রমে অঢেল টাকা পয়সার মালিক হয়ে যাওয়া যায়। রাজনীতিকেই একসময় এরা পেশা বানিয়ে ফেললেন অবলীলায়। তাই আমরা তাত্ত্বিকভাবে যতই বলি না কেন রাজনীতি কোন পেশা নয়, সে কিন্তু বাস্তবতায় বাতুলতা রূপেই পরিগণিত হবে। রাজনীতি যখন পেশা হয়ে উঠে তখন সেই পেশার অংশীদার হতে বহুজন উঠেপড়ে লাগবেন। আর তাই একটি পদ পেতে এত লোকের বিরামহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। তিন ইউনিটে ১৩ জনের সভাপতি হওয়ার মূল কারণ বোধ করি এখানেই নিহিত।
রাজনীতি কতটা দৃর্বৃত্তায়িত, নীতিহীন ও স্বার্থান্ধ হয়ে উঠেছে, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই সত্য প্রতিদিনই সাধারণ মানুষের চোখে উন্মোচন হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন ক্লাবে জুয়া ও মদের আসর ধরার যে অভিযান চলমান রয়েছে, দেখা যায় এর সাথে জড়িতরা কমবেশি সকলেই রাজনৈতিক দলের নানা পর্যায়ের নেতা। বড় নেতা হওয়ার দরকার নেই পাতি নেতা হয়েই কাড়ি কাড়ি টাকা কামানো যায়। জি.কে. শামীম কে এতদিন কেউ চিনতেন না। এই অচেনা ব্যক্তিটির একটি অফিস থেকে ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের কাগজপত্র উদ্ধার করা গেছে। এক ডাকসাইটে বামনেতার নাম উঠে এসেছে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী আরেক ক্লাবের চেয়ারম্যান হিসাবে। রাজনীতির মাধ্যমে যখন রাতারাতি কুবেরের মত সম্পদশালী হয়ে পড়া যায় তখন সকলেই এখানে আসতে চাইবেন তাতে আর আশ্চর্য কী।
মনের মধ্যে মহত্তম কিছু বাসনা লালনকারী নেত্রী শেখ হাসিনা যখন রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে কিছু শুরু করেন তখনই উঠে আসে রাজনীতিকে পচিয়ে দেয়া এইসব দুর্বৃত্তদের নাম। কিন্তু এইভাবে কি রাজনীতির দুর্বৃত্তপনা বন্ধ হবে? হবে না, কিন্তু শেখ হাসিনা চেষ্টা করে চলেছেন, এইটুকুই বা কম কি? যারা আদর্শিক অবস্থানকে ভুলে গিয়ে নিছক ব্যক্তিস্বার্থে পদ-পদবির জন্য হন্যে হয়ে উঠেছেন তাদেরকে অনুরোধ করি শেখ হাসিনার অভিপ্রায় অনুধাবন করার।