পবিত্র ঈদুল আজহা- মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটুক

রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমান সম্প্রদায়ের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। এই দিনে সম্পন্ন মানুষ পশু জবেহ করে মহান সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ পালনের পাশাপাশি নিজেদের ভিতরকার পশুপ্রবৃত্তিকে ত্যাগ করার প্রয়াস করেন। ঈদুল আজহার ধর্মীয় মূল তাৎপর্য আধ্যাত্মিক মহিমার বাইরেও সামাজিক পরিম-লে বিশেষ গুরুত্ববহ। ইসলামের মহান সাম্যের বাণী এদিনে মূর্ত হয়ে উঠার একটি সুযোগ পায়। নিয়ম মোতাবেক কোরবানির পশুর মাংসকে সমান তিন ভাগে ভাগ করতে হয়। এক অংশ নিজের জন্য রেখে অন্য এক অংশ গরিব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী এবং অবশিষ্ট অংশ গরিব মানুষের মাঝে বিলি করে দিতে হয়। মাংসের ভাগ করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, প্রতিটি অংশই যেন একই মানের হয়। ইসলামের এই সাম্যবাদী বিধানের কারণে কোরবানি দিতে অক্ষম অসংখ্য মানুষও ঈদুল আজহার সার্বজনিন আনন্দে শরিক হওয়ার সুযোগ পান। অন্যদিকে এ সময় মুসলমানরা ধর্মীয় আরেক বিধান জাকাত উসুল করে থাকেন। সঞ্চিত ধনসম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার নামই জাকাত। ইসলামের এই অর্থনৈতিক বিধানটিও অতিশয় সাম্যবাদী। সকল মানুষ যদি জাকাত উসুলের বিধানটি পালন করেন তাহলে দেশ থেকে দারিদ্র হটানো বিশেষ কোন সমস্যা নয় বলেই বিজ্ঞজনরা মনে করেন। এইসব বিধানাবলী প্রমাণ করে সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানুষে মানুষে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্যই ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। মানুষ যদি ধর্মের এই পবিত্র বিধানগুলো যথাযথভাবে বিশ্বাস ও পরিপালন করত তাহলে বিশ্বব্যাপী আজ যে হিংসা, বঞ্চনা, দারিদ্রতা, অশিক্ষা; ইত্যাদি মন্দ উপসর্গগুলো মানব জাতিকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, তার অবসান ঘটত। বিরাজমান বিশ্ব ব্যবস্থাই প্রমাণ করে আমরা ধর্মের মূল জায়গা থেকে সরে এসে ধর্মকেও অনেকটা ইহজাগতিক লাভালাভের বিষয় বানিয়ে ফেলেছি। যত না দ্রুত মানব জাতি ধর্মের মূল বিধানাবলীতে ফিরে আসবে, তত সুদূর পরাহত হবে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ ও বিশ্বজনীন সুষম উন্নয়ন আকাক্সক্ষা। আমরা এই পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মানব জাতির মধ্যে শুভবোধের জাগৃতি কামনা করি।
ঈদ উপলক্ষে অনেকেই কর্মস্থল ছেড়ে নিজস্ব ঠিকানায় গিয়েছেন। ঈদের ছুটি শেষ হলে আবারও তারা কর্মস্থলে ফিরে আসবেন। এই যাতায়াতের বিষয়টি ইদানিং হয়ে উঠেছে সাংঘাতিকভাবে বিপদসংকুল। সড়ক দুর্ঘটনা নামক উপসর্গ আজ সড়ককে সবচাইতে বড় ঘাতকে পরিণত করেছে। ঈদ উপলক্ষে যারা যাচ্ছেন, যাবেন এবং ফিরে আসবেন, সকলের নিকট আমাদের অনুরোধ আপনারা সব ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করে পথ চলবেন। আমরা আপনাদের নিরাপদ যাত্রা কামনা করি। ঈদে যারা পশু কোরবানি করবেন তারা যাতে নির্দিষ্ট স্থানে জবেহ করার কাজ সমাধা করেন এবং জবেহকৃত পশুর বর্জ্য নিজ দায়িত্বে অপসারণ করে পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন হন সেই কামনা করি আমরা। কারণ পবিত্রতাও ইমানের অংশ।
সব ধর্মই মূলত মানব জাতির কল্যাণের কথা বলে। কিন্তু জাগতিক ব্যবস্থা আজ সেখানে তৈরি করেছে অসংখ্য বিভাজন, বানিয়েছে ভেদরেখা; যা থেকে উদ্ভব ঘটেছে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে, এক ধর্মের অনুসারীদের সাথে অন্য ধর্মের অনুসারীদের বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল আমাদের পিছিয়েই দিচ্ছে। ধ্বংস করছে মানব জাতির বহু সম্ভাবনা। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে আমাদের কামনা হলো, মানুষে মানুষে যাবতীয় ভেদাভেদ ঘুচে যাক। পুরো পৃথিবী পরষ্পর পরষ্পরের ভাই হয়ে এক সাথে বেঁচে থাকার সুযোগ পাই। সকলকে ঈদ মোবারক।