পরনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা ও আলোর ফাঁদ

শস্য ক্ষেতের পোকা দমনে কীটনাশকের বদলে প্রাকৃতিক পদ্ধতি হিসাবে আলোর ফাঁদ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। কৃষি কাজে রাসায়নিক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমাদের কৃষকরা যে বেশ সচেতন হচ্ছেন জামালগঞ্জে আলোর ফাঁদ ব্যবহার থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এ থেকে প্রমাণ হয় না যে, আমাদের কৃষি ব্যবস্থা সর্বনাশা কর্পোরেট বেনিয়াবৃত্তির খপ্পর থেকে মুক্ত হয়েছে। বরং বলা যেতে পারে এই নাগপাশ আরও শক্ত হচ্ছে। ধীরে ধীরে কৃষিতে কৃষকের অধিকার লুপ্ত হচ্ছে। ব্যাপকভাবে কৃষিতে মুনাফাবাজ কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসন এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান। কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বহু আগেই আমরা স্বনির্ভরতা হারিয়েছি। বীজ থেকে শুরু করে সার ও অন্যান্য রাসায়নিক সহ সেচ ব্যবস্থার জন্য আজ সম্পূর্ণভাবে দেশি-বিদেশী কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি। উৎপাদনের পর এখন বিপণন ব্যবস্থাটিও ক্রমশ ওই গুটিকয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। এখন বাজারে গেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে চাল বিক্রি হতে দেখা যায়। স্বাভাবিক বাজার দরের তুলনায় ব্র্যান্ডেড এসব চালের দাম অনেক বেশি থাকে। এই বৃহৎ পুঁজির সর্বশেষ লক্ষ্য হবে কৃষি জমির উপর তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটি করতে পারলে ৪০ টাকা কেজির চাল আমরা ১০০ টাকা দরে কিনতে বাধ্য হব। কৃষিতে যেভাবে এই আগ্রাসন চলমান রয়েছে তাতে ওই দুর্দিন আসতে বেশি দিন বাকি নেই বলে অনেকেই মনে করেন। বৃহৎ পুঁজি সর্বদা মুনাফার অণে¦ষণে ব্যতিব্যস্ত থাকে। মুনাফার জন্য সবকিছু করতে পারে তারা। এখানে নীতি-নৈতিকতা, জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি-পরিবেশ; সবকিছুই তুচ্ছ। সুতরাং জামালগঞ্জে আলোর ফাঁদ জনপ্রিয় হওয়ার যে খবর পাওয়া গেছে সেটি তখনই সুসংবাদ হতে পারে যখন কৃষিতে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা উৎপাদন ব্যবস্থায় জাতীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে।
আলোর ফাঁদ দিয়ে পোকা দমনের এই পদ্ধতিটি আমাদের ঐতিহ্যবাহী সনাতন কৃষি-ব্যবস্থারই একটি উন্নত ধাপ মাত্র। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই পদ্ধতিটি জনপ্রিয় করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। আলো নিজের দিকে সবকিছুকে আকর্ষণ করে। বিশেষ করে যখন অপরাপর এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে তখন অন্ধকার এলাকার প্রাণী আলোর দিকে ধাবিত হয়। শস্য ক্ষেতের অনতিদূরে স্থাপন করা হয় এই আলোর ফাঁদ। রাতের বেলা অন্ধকারাচ্ছন্ন ক্ষেতের সমস্ত পোকা ওই আলোর দিকে ছুটি আসে। ফাঁদের নীচে বসানো থাকে পানি ভর্তি গামলা। ছুটে আসা পতঙ্গ ওই পানিতে পড়ে মারা পড়ে। পোকা দমনে এই পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর বলেও প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা এভাবে রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার, ভার্মি কম্পোস্ট প্রভৃতি আবিষ্কার করেছেন। এইসব আবিষ্কারের উদ্দেশ্য হলো খাদ্যের ক্ষতিকারক প্রবণতাকে রোধ করা। কিন্তু বাস্তবত এইসব উপকারী আবিষ্কারগুলো শেষ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে স্থায়িত্ব পায় না বলেই আমরা দেখতে পাই। কারণ ওই একটাই। কর্পোরেট পুঁজির সবকিছু গিলে খাওয়ার উদগ্র লালসা।
আমরা যতই উন্নয়নের নানা গালগল্প বলি না কেন, আসলে এখন পর্যন্ত আমাদের উন্নয়নের প্রধান জায়গা হলো কৃষি। সংগ্রামী কৃষক সমাজের অদম্য প্রচেষ্টা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় খাদ্য নিরাপত্তার জায়গায় আমরা বেশ সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছি। এই সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি হওয়া বহু দুর্যোগ কিংবা সংকটেও আমাদের দেশ এখন একেবারে নেতিয়ে পড়ার জায়গায় নেই। বিশ্বব্যাপী যে মহামান্দার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে সেখানেও আমাদের এই সংগ্রামী কৃষকরাই শেষ ভরসা। তাই কৃষি ব্যবস্থায় স্বনিয়ন্ত্রণ ও কৃষকের অধিকার স্থাপন সবচাইতে জরুরি। আর তখন আলোর ফাঁদও তার পূর্ণ মাহাত্ম্য নিয়ে উদ্ভাসিত হবে।