পরাণ যায় জ্বলিয়ারে…

প্রবল পরাক্রান্ত মার্ত- প্রতাপে মাটির মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা শুরু হয়েছে। আবহাওয়ার স্বাভাবিক চরিত্র ধারণ করেই জ্যৈষ্ঠের আকাশে মার্ত- এমন দুর্দান্ত তেজ পেয়েছে সত্য এবং এরকম না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ সর্বাবস্থায় আরামপ্রিয়। সে সবসময় চায় একটি অনুকূল পরিবেশ। যখনই সহনীয় মাত্রার চাইতে সেই পরিবেশ কিছুটা চরম অবস্থার দিকে ধাবিত হয় তখন মানুষের জন্য সেটি হয়ে উঠে অসহনীয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষভাগে এসে বৃষ্টিপাত কম থাকার কারণে তাপদাহ বেড়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নাগরিক সুবিধাদির যন্ত্রণাদায়ক বিড়ম্বনা। শুক্রবার দিনের অধিকাংশ সময় শহরে বিদ্যুৎ ছিল না। শহরের অধিকাংশ টিউবওয়েল অকেজো। অসহনীয় গরম ও পানির অভাবে তাই শুক্রবারের নাগরিক জীবন ছিল সত্যিকার অর্থেই নরক বাসের মতো। যেখানে কোন সুবিধাদি নেই সেখানে মানুষ সেইভাবেই অভ্যস্ত হয়ে উঠে। কিন্তু সুবিধাদি ভোগ করার অভ্যাস গড়ে উঠার পর যখন সেটি হাতের নাগালে পাওয়া যায় না তখন ‘পরাণ যায় জ্বলিয়া রে…’ অবস্থায়ই হয়ে উঠে আক্ষরিক অর্থে। শহরের মানুষ এখন এসি, ফ্যানে অভ্যস্ত। পুকুর নেই কোথাও। পৌর পরিষেবার পানি অথবা নিজেদের ব্যবস্থায় মোটর দিয়ে তোলা পানিতেই মানুষের অভ্যস্ততা। তাই শুক্রবারের দিনে বিদ্যুৎহীনতার কারণে যে নাগরিক দুর্ভোগ তৈরি হয়েছিল তা বলে বুঝানো দুষ্কর বটে। সভ্যতার বিড়ম্বনা বা পরিহাস বুঝি একেই বলে। প্রকৃতির সাথে সখ্যতা গড়ে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলার পরিবর্তে কৃত্রিম ও যান্ত্রিক আরাম-ব্যবস্থার ফাঁকতাল একেই বলে। সভ্যতার ভিতটি শক্ত না হলে এমন বিড়ম্বনা তখন হয়ে উঠে নিত্ত নৈমিত্তিক। কিন্তু মানুষ মাত্রই প্রতিক্ষণ অগ্রগতির পথে হাঁটতে চায়। সে এখন যে অবস্থানে আছে পরক্ষণেই আরেকটু ভাল অবস্থানে পৌঁছতে চায়। মানুষের মনে অগ্রগতির এই যে চিরন্তন আকাক্সক্ষা সেটিই মানব সভ্যতার মূল নিয়ামক। এই আকাক্সক্ষাবোধ না থাকলে আমরা সেই আদিম গুহামানব হয়েই জীবন কাটাতাম। তবে অগ্রগতির আকাক্সক্ষার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে যে প্রপঞ্চটি সমান গতিতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে সেটি হলো ভোগবাদিতা। ভোগবাদিতা থেকে জন্ম নেয় দুর্নীতি যা অন্যের অধিকার হরণের সমার্থক বটে। এই প্রপঞ্চটির কারণে সভ্যতার চরম বিকশিত যুগে বসেও আমরা প্রতিনিয়ত যন্ত্রণায় দগ্ধ হই, নানাবিধ কষ্টে আক্রান্ত হই, সভ্যতার অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়ে অসহায়ভাবে। নাগরিক সুবিধাহীন ২৫ জ্যৈষ্ঠ শুক্রবারটি তাই হয়ে উঠেছিল তাপদাহের তীব্র আক্রমণে বিপর্যস্থ এক শহরে। যেখানে গরমের সাথে পানির কষ্ট মানুষকে ভোগিয়েছে নিদারুণভাবে।
এই অবস্থায় নাগিরকসমাজের একমাত্র আকুতি হল বহুমুখী নাগরিক সেবার আয়োজনগুলোকে নির্বিঘœ রাখা। নির্বিঘœ রাখার জন্য পরিষেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক বেশি মানবিক হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে জ্যৈষ্ঠ মাসের তীব্র তাপদাহে বিদ্যুৎ ও পানি হীনতার কারণে মানুষের কষ্ট কতটা চরমে পৌঁছাতে পারে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বাইরে আপাতত আর কোন উপায় জানা নেই আমাদের এই ধরনের দুর্ভোগ যন্ত্রণা থেকে উপসম পাওয়ার। আরেকটি বিষয় রয়েছে উল্লেখের। নাগরিক সেবাগুলো যেহেতু যন্ত্রনির্ভর, তাই যন্ত্র যেকোন সময় বিগড়ে যেতেই পারে। যন্ত্রের এই বিগড়ে যাওয়ার সময়টি যাতে কষ্টদায়ক না হয়ে উঠে সেজন্য দরকার বিকল্প ব্যবস্থার। প্রত্যেকটি পরিষেবা কাঠামোকে সচল রাখেন এক দল মানুষই। মানুষ মানুষের কাছে এইটুকু প্রত্যাশা না করলে কোথায় যাবে?