পরিবর্তন কোন দিবস বা সপ্তাহের মাধ্যমে সূচিত হয় না

দেশব্যাপী জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহ পালিত হচ্ছে বেশ সাড়ম্বরে। এই সপ্তাহ পালন করতে যেয়ে সেবা সংক্রাস্ত উদ্যোগ বাড়ানোর পরিবর্তে গতানুগতিক র‌্যালি, সভা, নতুন গেঞ্জি পরিধান, খানাপিনা ইত্যাদি প্রচার সর্বস্ব কর্মসূচী পালিত হচ্ছে সর্বত্র। স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর মূল অভীষ্ট গোষ্ঠী হচ্ছে রোগী এবং স্থান হচ্ছে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলো। যে কোন দিবস বা সপ্তাহ পালনের অগ্রভাগে যে উদ্দেশ্যটি নিহিত থাকে তা হলো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেয়া, সেবা প্রাপ্তিকে সহজ ও সুলভ করা। কিন্তু বাংলাদেশে রোগী মাত্রই জানেন স্বাস্থ্য সেবা পরিকাঠামোটি এখন কেমন মুনাফামুখী হয়ে উঠেছে। সামান্য ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হলেও গাদা গাদা পরীক্ষার লিস্ট ধরিয়ে দেয়া হয় রোগীর হাতে। সেই পরীক্ষা অন্তে রোগী বা তার অভিভাবকের পকেট থেকে খসে পড়ে বেশ কয়েক হাজার টাকা। রোগটি যদি একটু জটিল ধরনের হয় তাহলে তো কারবার পাক্কা। জটিল রোগ নির্ণয় হোক বা না হোক, রোগ নির্ণয়ের জায়গায় চিকিৎসকের দক্ষতা থাকুক বা না থাকুক; রোগীর পকেটকে টাকশাল ভেবে সেখানে হামলে পড়তে দ্বিধা করেন না স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষগুলো। সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে (বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া) চিকিৎসা হয় সেটি ভুলতে বসেছে এই দেশের নাগরিক সমাজ। ফলত যাদের হাতে টাকা নেই এখন তাদের জন্য চিকিৎসা প্রাপ্তি হয়ে গেছে সোনার হরিণের মতো দুর্লভ বস্তু। এরকম প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহ পালনের সূত্রে জন মনে যে আশাবাদ জাগ্রত হয়, তথাকথিত কিছু কর্মসূচী পালনের অন্তরালে সেই আশার অপমৃত্যু ঘটে বললে অত্যুক্তি করা হবে না।
সরকার এবার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতির ব্যাপারে বেশ তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। সময়ের ব্যবধানে সেই তোড়জোড় এখন কমেছে। অবস্থা যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন হয়ে আছে। ডিজিটাল এটেনডেন্স চালু হলেও আদৌ ওই মেশিনগুলো এখন আর সচল রয়েছে কিনা সেটি নিয়ে আর মাতামাতি নেই। আমরা বড় হুজুগে জাতি। একটা কিছু উপলক্ষ পেলেই হয়। এর ভিতর-বাহির সবকিছু খোলাসা না করে নিস্তার নেই। কিন্তু দুই দিন পর আবার সবকিছু ঠান্ডা। আসলে পরিবর্তন কোন দিবস বা সপ্তাহের মাধ্যমে সূচিত হয় না। পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা মনের ভিতরে জাগাতে হবে। মনের তাগিদে যদি জাতিগত একতায় কোন কিছুকে পাওয়ার জন্য কাজ শুরু করা যায় তাহলে সেটি অর্জন করা দুরুহ নয়। একাত্তরে দেশ স্বাধীন করে এই জাতি সেটি দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি স্বাধীন দেশের অবয়ব কেমন হতে পারে আমরা সেই জায়গায় একেবারেই কর্তব্য বিচ্যুত রয়ে গেলাম। ফলে স্বাধীনতা লাভের ফলে মানুষ চিত্তের শান্তি পাওয়ার জায়গায় আর যেতে পারেনি। কিছু কায়েমি গোষ্ঠীর হাতেই স্বাধীনতা বন্দী হয়ে পড়েছে। সত্যিই যদি আমরা মহৎ কিছু অর্জন করতে আগ্রহী হই তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে চিত্তের ভিতরে লোভের যে আগুন জ্বালানো সেটিকে নিভাতে হবে। সর্বত্র স্বাস্থ্য সেবা সুরক্ষার জন্যও এমন দৃঢ়চেতা কর্তব্য বোধের শপথ নিতে হবে। নচেৎ সপ্তাহ শেষে অবস্থার কোন ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে না। মাঝখানে দিবস বা সপ্তাহ পালনের নামে অঢেল টাকারই অপচয় ঘটবে কেবল।
আসুন যে যেখানে আছি মনের কালিমা দূর করে এই দেশটাকে ভালবেসে নিজের কাজটুকু করি। সকলে এইভাবে কাজ করলে প্রিয় দেশটির চিত্র পালটে যাবে সামান্য সময়ের ব্যবধানে।