পরিবার থেকেই জাগ্রত হোক প্রতিবাদ

মাদকাসক্ত ছেলে ও ভাতিজাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ধর্মপাশার সেলবরষ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো: নূর হোসেন। পারিবারিক পর্যায়ে তিনি বহু চেষ্টা করেও ছেলে ও ভাতিজাকে কুনেশার কবল থেকে মুক্ত করতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে তিনি তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করেছেন। তিনি বুকের মধ্যে কতটা কষ্ট চেপে রেখে এই কঠিন কাজটি করেছেন তা সহজেই অনুমেয়। এই কঠিন সিদ্ধান্তের কারণে তিনি পারিবারিক পরিম-লে প্রবল সমালোচনার শিকার হতে পারেন। তারপরও তিনি কর্তব্যচ্যুত হননি। নিজে যেহেতু সংশোধন করাতে পারেননি তাই তিনি রাষ্ট্রের হাতে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। একজন পিতা বা চাচার পরিচয়ের বাইরে এখানে তার সামাজিক সত্তাটি বড় হয়ে উঠেছে। তিনি ছেলে-ভাতিজার কুকর্ম এড়িয়ে থাকতে পারতেন অথবা প্রশ্রয়ও দিতে পারতেন, সামাজিক অবস্থানের নিরিখে তার সেই ক্ষমতা ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। না করে এক সমাজমনস্ক ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে সেই জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন যেখানে ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতির উর্দ্ধে উঠে কর্তব্যবোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে উঠে মানুষ। তাঁকে আমাদের প্রণতি। জনাব নূর হোসেন, আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে, একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে সকলকে দেখিয়ে দিয়েছেন সমাজ সচেতন একজন ব্যক্তির কেমন হওয়া উচিত। আজ আপনি হয়তো ছেলে ও ভাতিজার কারাবাসে অন্তর থেকে রক্তক্ষরণের শিকার হচ্ছেন কিন্তু আমরা আপনার এই দৃষ্টান্ত দেখে শত মুখে বলতে পারব, কে বলেছে এই সমাজে কর্তব্যবান ব্যক্তির আকাল পড়েছে? আপনাকে দেখিয়ে বলব, ওই দেখুন নূর হোসেন আছেন যিনি নিজ ছেলে-ভাতিজার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি।
মাদকাসক্তি আমাদের সমাজের কঠিন এক সমস্যা। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ভিতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে এই আসক্তি। রাষ্ট্র মাদক নির্মূলের ব্যাপারে অতিশয় সজাগ ও দৃঢ়। রাষ্ট্র তার মতো করে মাদক বিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলও মিলছে। কিন্তু মাদক নির্মূলে আসল যে কাজ সেটি দেখিয়ে দিয়েছেন ধর্মপাশার নূর হোসেন। মাদকাসক্তি সমস্যাটি যতটা না আইন-শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা তার চাইতেও বেশি এটি সামাজিক সমস্যা। সমাজ যদি এই সমস্যা দূর করতে উদ্যোগী না হয় তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষে সর্ব বিস্তৃত এই সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব নয়। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তিকে নূর হোসেনের মতো কঠোর ও সচেতন হতে হবে। নিজের আশ-পাশকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। সমাজ প্রতিরোধী হলে কারও সাধ্য নেই অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার। যারা মাদক সেবন করে তারা নিশ্চয়ই নূর হোসেনের মতোই কারও না কারও পরিবারের সদস্য। ওই পরিবার প্রধানরা যদি নিজের সন্তান-সন্ততির অধঃপতন রোধ করতে নূর হোসেনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে আমাদের বিশ্বাস মাদকাসক্তি দূর করতে সময় বেশি লাগবে না।
নূর হোসেন শুধু মাদকের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেননি। তিনি দেখিয়ৈ দিয়েছেন সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। এই প্রতিরোধ ঘুষ-দুর্নীতি, ধর্ষণ-অপহরণ, খুন-সংঘর্ষ, চুরি-ডাকাতি, জুয়া-বেহায়াপনা; সবকিছুতেই জারি করা সম্ভব। কারণ যে যেধরনের অপরাধই করুক তার বিরুদ্ধে যদি পরিবার থেকে প্রতিবাদ জাগ্রত হয় তাহলে কষ্মিনকালেও ওই অপরাধী নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। সমাজের ভিতর থেকে প্রতিবাদের এই ধারাটি যত প্রবল হবে ততই আমরা মুক্ত হব যাবতীয় খারাপ প্রপঞ্চ থেকে। তাই আসুন, ধর্মপাশার বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর হোসেনের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যে যার পরিবারের অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চক্রব্যূহ রচনা করি।