পহেলা বৈশাখ- বাঙালির সার্বজনীন উৎসব

স্টাফ রিপোর্টার
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় বৈশাখকে এভাবেই ধরাতলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবির কিরণে হাসি ছড়িয়ে পুরনো বছরের সব গ্লানি, অপ্রাপ্তি, বেদনা ভুলে নব আনন্দে জাগবে গোটা জাতি। আজ পহেলা বৈশাখ। একটি নতুন দিন, একটি নতুন বছরের সূচনা। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৫। চৈত্রের রূদ্র দিনের পরিসমাপ্তি শেষে আজ বাংলার ঘরে ঘরে নতুন বছরকে আবাহন জানাবেন সকলে। বাঙালির জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন এই পহেলা বৈশাখ। আজ নব আলোর কিরণশিখা শুধু প্রকৃতিকে নয়, রঞ্জিত করে নবরূপে সাজিয়ে যাবে প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ও। নব আলোর শিখায় প্রজ্বলিত হয়ে শুরু হবে আগামী দিনের পথচলা।
‘…নতুন যুগের বাণী এই যে,
তোমার অবলোকের আবরণ খোলো, হে মানব,
আপন উদার রূপ প্রকাশ কর।’
সময়েরও যে প্রাণ আছে, সেই প্রাণ যে মানুষের মিলনমেলায় চঞ্চল হয়ে ওঠে, সব ভেদ-বুদ্ধির আবরণ ভেঙে উষ্ণ সেই প্রাণের ছোঁয়া যে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-নির্বিশেষে সবাইকেই উদার ও বিকশিত আহ্ বান জানায়। সে কথাটি পহেলা বৈশাখের ভোরেই ভালোভাবে অনুভব করা যায়। এ কথাটিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন শান্তিনিকেতনে ১৩৩০ সনের পহেলা বৈশাখে নববর্ষের অনুষ্ঠানে।
কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল স¤্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন। ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে।
হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজ বাঙালি মাতবে বাঁধভাঙা উল্লাসে। উৎসব, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরে যাবে বাংলার মাঠ-ঘাট-প্রান্তর। আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো সব জরা গ্লানিকে মুছে ফেলে সকলে গেয়ে উঠবে নতুন দিনের গান। বৈশাখী উৎসবের মধ্যে দিয়ে যেন বাঙালি তার শিকড় খুঁজে পায়।
পুরাতন বছরের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসবে নববর্ষ উদযাপনে একসঙ্গে গাইবে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। গ্রাম থেকে শহর, গলি থেকে রাজপথ, আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ থেকে অফুরান প্রকৃতি সবখানেই দোলা দেবে বৈশাখী উন্মাদনা। মুড়ি মুড়কি, মন্ডা মিঠাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচে-গানে, ঢাকে-ঢোলে, শোভাযাত্রায় পুরো জাতি বরণ করবে নতুন বছরকে। অনেকেই সকালবেলা থেকেই মেতে উঠবে নগর সংস্কৃতির দান পান্তা-ইলিশ খাওয়ার উৎসবে। খোলা হবে বছরের নুতন হিসেব নিয়ে হালখাতা। চলবে মিষ্টিমুখের আসর।
বৈশাখী আমেজের মাঝেই বাঙালিরা খুঁজে পায় এক নতুন স্বাদ, নতুন করে জীবন চলার পথের প্রেরণা আর উদ্দীপনা। তাই বাঙালি জীবনে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষের জীবনে এ মাসে, এ ঋতুতে নেমে আসে এক নব আনন্দধারা। এ ধারায় সিঞ্চিত হয়ে মানুষ নব উদ্দমে পরের মাসগুলোর কর্মমুখর জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে-এটাই বাঙালি জীবনে বৈশাখের বৈশিষ্ট। এ কারণে বৈশাখের সঙ্গে বাঙালি-জীবনের অতি নিবিড় সম্পর্ক। সময়ের বিবর্তনের সাথে বৈশাখের অতীত চিত্র থেকে বর্তমান চিত্রের দারুণ বৈচিত্র এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্যও পরিলক্ষিত করা যায়। তবে আকর্ষণটা কিন্তু আরো গাঢ় হয়েছে।