পাগনার হাওরপাড়ে বিপন্ন মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি ও আকবর হোসেন
পাগনার হাওর ঘুরে এসে
সুনামগঞ্জের বৃহৎ পাগনার হাওরপাড়ের শতাধিক গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার সংকটে পড়ে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন। গত প্রায় ২০ বছর ধরে এরা জলাবদ্ধতার কারণে নিজেদের জমি চাষাবাদ করতে নানা সমস্যায় ভুগছেন। এবার এই সংকট আরো বেড়েছে। এই অবস্থায় হাওরপাড়ের লাখো মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়েছেন। এক ফসলি এলাকার এই কৃষকদের মধ্যে হাহাকার দেখা দিয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী পাগনার হাওর পরিদর্শন করে সংকট দূর করার আশ্বাস দিয়েছেন।
দক্ষিণে নেত্রকোনার খালিয়াজুরির চাকুয়া ও সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়ন, উত্তরে জামালগঞ্জ সদর উত্তর, পুর্বে ভীমখালী এবং পশ্চিমে ফেনারবাঁক ইউনিয়ন নিয়ে পাগনার হাওর। বৃহৎ এই হাওরের ভেতরে ছয়হারা ভান্ডা বিল, ভান্ডা মল্লিকপুর, রাজাবাজ, কুরাইল্লার, বিনাজুরা, দিরাই বিল, ছয়হারা পিঠাইল্লা, বাঘেরকোণা, ডাবাছোড়া. গজারিয়া, ধনারকোণাসহ অসংখ্য ছোট ছোট বিল ও হাওর রয়েছে। হাওরের বেশিরভাগ জমি ফেনারবাঁক ইউনিয়নের কৃষকদের। অন্য ইউনিয়নগুলোর কৃষকদেরও জমি রয়েছে। হাওরে জমি রয়েছে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর। গত প্রায় ২০ বছর ধরে পলিমাটি পড়তে পড়তে এই হাওরের অভ্যন্তরের কানাইখালি নদী এবং গজারিয়া ও কালিবাড়ী খাল ভরাট হয়ে গেছে। গত ১০ বছর পাওয়ার পাম্প কাজে লাগিয়ে হাওরের অর্ধেকেরও বেশি জমি আবাদ করেছেন কৃষকরা। কিন্তু এবার জলাবদ্ধতা বেশি হওয়ায় ৮০ ভাগেরও বেশি জমি অনাবাদী রয়েছে। কৃষকরা বলেছেন,‘এমন ভয়াবহ সংকটে এলাকার শতাধিক গ্রামের মানুষ এলাকা ছেড়ে যাবার চিন্তা করছেন।’
পাগনার হাওরপাড়ের ছয়হারা গ্রামের সুশেন তালুকদার বললেন,‘৩ হাল (১২ একর) জমিন আছে, ৪-৫শ’ মণ ধান পাইতাম, ২০ বছর হয় ধান পাই দুই-আড়াই’শ মণ, গত বছর ১ মণও পাইছি না, ইবার (এবার) খেতও রোয়াই দিছি না  (রোপন করছি না), গরু বেইচ্ছা (বিক্রি) শেষ, অনেকে চিন্তা করের এলাকা ছাইড়া যাইবোগি, কেউ কেউ দেশ ছাইড়া যাইবোগি, জমি-বাড়ীওতো কেউ কিনতো নায় (কিনবে না) কেউ।’
ছয়হারা গ্রামের রণদা প্রসাদ তালুকদার বলেন,‘গত ৩-৪ বছর পাওয়ার পাম্প দিয়ে পানি সেচ দিয়ে কিছু জমি  
চাষাবাদ করেছি, এবার কোন জমি করা যায়নি, কেউ কেউ ভোলাগঞ্জ, জাফলং, কেউ আবার ঢাকায় গার্মেন্টেসে গিয়ে কাজ করছে। যারা গ্রামে আছে তারা সরকারের দেওয়া ৩০ কেজি চাল ৫০০ টাকা পেয়ে বেঁচে আছে।’
এই গ্রামের রাজেন্দ্র তালুকদার বললেন,‘অনেকে জমিন রংজমা নিয়ে (অগ্রিম টাকা দিয়ে) বর্গচাষ করতে চেয়েছিল, কোন জমি চাষাবাদ করতে পারেনি, এজন্য টাকা জমির মালিকদের কাছ থেকে ফেরৎ নিচ্ছে এখন।’
গ্রামের কাজল তালুকদার বললেন,‘হাওরপাড়ে যাদের একসময় তালুকদারি ছিল, তাঁরা এখন মৎস্যজীবী, পেট না বাঁচলে লজ্জা-শরম রাখা যায় কীভাবে।’
গ্রামের চন্দ্রধর তালুকদার বলেন,‘৫ বছর ধরে ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার খরচ দিতে পারি না আমরা, যাদের বড় ছেলে- মেয়ে আছে তারা বেশির ভাগেই চাকুরিতে, না হয় মাছ ধরে বিক্রি করে জীবন চালায়।’
গ্রামের বৃন্দাবন তালুকদার বললেন,‘পাগনা বেড়ী বাঁধের ভেতরের ছোট ছয়হারা ঢালার হাওরে ছয়হারা, গঙ্গাধরপুর, খোঁজারগাঁও, তেঘরিয়া, উজান দৌলতপুর, ভাটি দৌলতপুর ও বিনাজুরার কৃষকদের জমি রয়েছে। পাগনার হাওরে ফেনারবাঁক ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের কৃষকের জমি রয়েছে। এছাড়া দিরাইয়ের রফিনগর, উত্তর জামালগঞ্জ, ভীমখালি ও নেত্রকোণার খালিয়াজুরির চাকুয়া ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০০ গ্রামের কৃষক এই হাওরের উপর নির্ভরশীল। এরমধ্যে কমপক্ষে ১০০ গ্রামের কৃষক এক শতক জমিতেও রোয়া দিতে পারেনি। এদের এলাকা ছেড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় আপাতত নেই।’
ছয়হারা গ্রামের অখিল তালুকদার বলেন,‘কানাইখালি নদী কালিবাড়ী হয়ে পাগনার হাওর এবং পাগনার হাওর থেকে ডালিয়া নদী পর্যন্ত খনন করতে হবে। তাহলে পানি পিয়াইন নদীতে যাবে। পিয়াইন নদীও খননের আওতায় আনতে হবে। গজারিয়া খাল খনন করতে হবে, তাহলেই পানি নিস্কাশন হবে। এই কাজ করবো, করছি করলে হবে না, এই মাসেই কাজ শুরু করতে হবে, না হয় পানি আসার আগে কাজ শেষ হবে না, দ্রুত কাজ করলে আগামী মৌসুমে হয়তো বিশাল এই হাওরে চাষাবাদ হবে, না হয় হাওরপাড়ের অনেক কৃষক জমির ভরসাই ছেড়ে দেবেন।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘গজারিয়া খাল ডিজাইন অনুযায়ী কাটার জন্য দ্রুতই দরপত্র আহ্বান করা হবে। কানাইখালিতে কাজ করার জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে। এ বছর কিছু হবে। পরের বছর এই কাজ শেষ করা হবে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন,‘চীনের হুয়াংহু নদী যেমন দুঃখ ছিল, পাগনার হাওরপাড়ের মানুষের তেমনিই দুঃখ এখন পাগনার হাওর। কানাইখালি ও গজারিয়া খাল উঁচু হতে হতে এখন হাওরের পানিই নামছে না, হাওরের একখন্ড জমিও চাষাবাদ হয়নি। আড়াই কোটি টাকা খরচ করলেই দুই খাল খনন সম্ভব, এবার কাজ করলে আগামী বছর ফসল হবে, না হয় আগামী বছরও জলাবদ্ধতার কারণে চাষাবাদ হবে না।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শনিবার জলাবদ্ধ পাগনার হাওর দেখতে এসে হাওরবাসীকে আশ্বাস দিয়ে বললেন,‘এই কাজ আমরা যত দ্রুত সম্ভব করবো।’