পাগনার হাওরে জলাবদ্ধতা বিপাকে লাখো কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের বৃহৎ পাগনার হাওরপাড়ের শতাধিক গ্রামের মানুষের জলাবদ্ধতার শঙ্কা এবারও কাটছে না। গত প্রায় ২০ বছর ধরে এসব গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার কারণে নিজেদের জমি চাষাবাদ করতে নানা সমস্যায় ভুগছেন। এবারও এই সংকট থাকতে পারে বলে আশংকা করছেন হাওরপাড়ের লাখো কৃষক। অবশ্য. এই হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করতে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি খাল খননের দরপত্র আহ্বান শেষে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কাজ শুরু না হওয়ায় এবারও একমাত্র ফসল বোরো চাষাবাদ নিয়ে চিন্তিত হাওরপাড়ের কৃষকরা।
দক্ষিণে নেত্রকোনার খালিয়াজুরির চাকুয়া ও দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়ন, উত্তরে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ সদর উত্তর, পুর্বে ভীমখালী এবং পশ্চিমে ফেনারবাঁক ইউনিয়ন নিয়ে পাগনার হাওর। বৃহৎ এই হাওরের ভেতরে ছয়হারা ভান্ডা বিল, ভান্ডা মল্লিকপুর, রাজাবাজ, কুরাইল্লার, বিনাজুরা, দিরাই বিল, ছয়হারা পিঠাইল্লা, বাঘেরকোণা, ডাবাছোড়া. গজারিয়া, ধনারকোণাসহ অসংখ্য ছোট ছোট বিল ও হাওর রয়েছে। হাওরের বেশিরভাগ জমি ফেনারবাঁক ইউনিয়নের কৃষকদের। অন্য ইউনিয়নগুলোর কৃষকদেরও জমি রয়েছে। হাওরে জমি রয়েছে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর। গত প্রায় ২০ বছর ধরে পলিমাটি পড়তে পড়তে এই হাওরের ভিতরে অবস্থিত কানাইখালি, গজারিয়া ও কালিবাড়ী খাল ভরাট হয়ে গেছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাওয়ারপাম্প কাজে লাগিয়ে হাওরের অর্ধেকেরও বেশি জমি আবাদ করেছেন কৃষকরা। গেলবছর জলাবদ্ধতা বেশি হওয়ায় ৮০ ভাগেরও বেশি জমি অনাবাদী ছিল। পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত বছর এই হাওরের জলাবদ্ধতা সরেজমিনে দেখে গেছেন
পাগনার হাওরপাড়ের কামারগাঁও গ্রামের রাধা কান্ত সরকার বলেন,‘পাগনার হাওরের পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা এখনো হয়নি। এই সপ্তাহের মধ্যে পানি নিস্কাশনের কাজ শুরু না হলে এবারও হাওরে চাষাবাদ হবে না। পানি নামার খালগুলো দিয়ে ২-৩ দিন পরে আর পানি নামবে না। খালগুলো খনন না হলে জলাবদ্ধতা থেকেই যাবে।’
পাগনার হাওরপাড়ের গজারিয়া গ্রামের খলিলুর রহমান বলেন,‘হাওরের পানি নামবে কি-না, এখনো বলা যাচ্ছে না। পানি কী পরিমাণে নিস্কাশন হবে আরও কয়েকদিন না গেলে বুঝা যাবে না।’
হাওরপাড়ের ভুতিয়ারপুর গ্রামের আবু তাহের বলেন,‘উজানের দিরাই ও সুনামগঞ্জের কিছু অঞ্চলের পানি পাগনার হাওরে এসে আটকা পড়ে। ভুতিয়ারপুর গ্রামের পেছনের নদী খনন করতে হবে। গ্রাম রক্ষার জন্য ব্লকও বিছানো লাগবে। গ্রামের পাশের মাদ্রাসার পাশ দিয়ে স্লুইসগেট করতে হবে। তাহলেই হাওরের পূর্বাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর হবে।’
হাওরপাড়ের মাতারগাঁও গ্রামের উৎপল তালুকদার বলেন,‘হাওরের পানি নিস্কাশনের এলংজুরি খাল শুকিয়ে গেছে, সপ্তাহ্খানেক পরে ঐ দিক দিয়ে আর পানি নামবে না। স্বেচ্ছাশ্রমে এই খাল খনন করার জন্য চিন্তা করছে মানুষ।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু তালুকদার বলেন,‘বোরা চাষাবাদের চারা বপনের সময় হয়ে গেছে। কিন্তু পানি দ্রুত না নামলে এই চারা রোপন করা যাবে না। চারার বয়স বেশি হয়ে যাবে। আজ মঙ্গলবার ঢালিয়া স্লুইসগেটের ঢালা খুলে দেওয়া হয়েছে। পানি নামাও শুরু হয়েছে।’ তিনি জানান, পিয়াইন নদীর দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়নের একটি অংশ, নেত্রকোণার খালিয়াজুরি’র বল্লি ইউনিয়নের একটি অংশ এবং জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক’র কুর্দনপুরের পশ্চিমাংশ ভরাট হয়ে গেছে। এই অংশগুলো খনন না হলে পানি নামবে না। আমরা যা করছি ‘কাপনা’ দিয়া সমুদ্র সেঁচের মত কাজ করছি।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক বলেন,‘পাগনার হাওরের পানি নিস্কাশনের ব্যাপারে আমরা খুবই আন্তরিক। এই হাওরের পানি নামানোর জন্য ২ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে গজারিয়া খাল এবং ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কানাইখালী খাল খননের দরপত্র আহ্বান এবং মূল্যায়ন শেষে ঠিকাদার নিয়োগ এবং কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এই হাওরের পানি নিস্কাশনের খাল খনন শুরু হবে। হাওরপাড়ের কৃষকদের দুশ্চিন্তাও কেটে যাবে।’