‘পানি না কমলে নিজেও মরমু পোলাপানও মরবো’

স্টাফ রিপোর্টার
জামালগঞ্জের বেহেলি ইউনিয়নের আরশিনগর গ্রামের মো. দিলোয়ার হোসেন। ছোট ৪ শিশু সন্তানকে নিয়ে পানিবন্দি ঘরে বসে চৌকিতে (থাকার খাট) আছেন। ঘরে কোমর সমান পানি। বললেন, আজ সকালে মা হারা চার সন্তানকে বিস্কুট খাইয়েছি, দুপুর পার হয়ে বিকাল হয়ে গেছে, এখনো কিছুই খাওয়াতে পারি নি। বচ্চারা খাবার দেবার জন্য বার বার বলছে, কী করবো বুঝতেছি না।
উঠানে পানি, ঘরেও পানি। বের হওয়ার কোন জায়গা নাই। কাজ কামও নাই। এখন কি খাইমু, কেমনে চলমু বুঝতেছি না।
সাচনাবাজার ইউনিয়নের হরিহরপুর (বাগহাঁটি) গ্রামের শামসুল হক বলেন, পানিতে আটকা পইড়া ঘরে বইসা আছি। চতুর্দিকে পানি। কোনানে যাইমু, কি করমু, কিছুই বোঝতাছি না। করোনার লাইগা এমনিতেই বিপদ। এর মাঝে বন্যা আইছে। মরারে ্আরও মাইরা ফেলার উপক্রম হইছে। কোন সাহায্য সহযোগিতা না পাইলে আর বাঁচমু না।
বেহেলী ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের প্রজেশ দে বলেন, হাত, পাও ঠান্ডা হইয়া আইতাছে। নিজেও মরমু, পোলাপানও মরব। এই বন্যায় গরু আর মানুষ এক ঘরে বসত করতা ছি। বিপদের উপর আরও বিপদ আইসা পড়ছে। কিভাবে বাঁচমু এই চিন্তায় জান বাঁচের না। আমরারে বাঁচাইতে সরকারি সাহায্য খুব দরকার।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার পশ্চিম হাজিপাড়া’র রূশনারা বেগমের ঘরে গলা সমান পানি। পাশের বাড়ি’র সিড়িতে রোববার রাত কাটিয়েছেন। আজ সোমবার সকালে এক মাইল হেটে আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে তিন সন্তান ও স্বামীর জন্য ভাত ও আলু ভর্তা করে এনেছেন। বিকালে কী করবেন জানেন না। করোনার ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রেও যাচ্ছেন না রূশনারা বেগম।
জামালগঞ্জের দিলোয়ার, শামছুল ও প্রজেশ, সুনামগঞ্জ শহরের রূশনারা’র কেবল নয় জেলাজুড়ে পানিবন্দি মানুষের এমন দুর্দশা।
জেলার ৮৭ ইউনিয়নের মধ্যে জেলা প্রশাসনের বন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, ৬১ ইউনিয়ন প্লাবিত। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ৬৬ হাজার ৮৬৯ টি। আশ্রয় কেন্দ্র সোমবার সকাল পর্যন্ত খোলা হয়েছে ১২৭ টি। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, বন্যাদুর্গতদের সরকারি নানা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, জেলার ১১ উপজেলা কমপ্লেক্স ভবনসহ আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা ১২৭ টি। বন্যা কবলিত এলাকায় ৪১০ মেট্রিকটন চাল এবং নগদ ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪ হাজার ৭৫২ টি পরিবারের জন্য শিশু খাদ্য দেওয়া হয়েছে উপজেলায় উপজেলায়। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করে বন্যা আক্রান্তদের আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে বলা হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্রে স্বাস্থবিধি মেনে সকলকে রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, সোমবার দুপুর ১২ টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপদ সীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল পানি। গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ১১ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানির উচ্চতা কমেছে। তবে জেলার ছাতক, দোয়ারা, বিশ^ম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।