পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত প্রশংসাজনক

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে বলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভাইস চ্যান্সেলর ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অচিরেই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আলমগীর। এই সিদ্ধান্তটিকে আমরা স্বাগত জানাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মৌসুমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সীমাহীন কষ্ট, দুর্ভোগ, অর্থের অপচয় লাঘব হবে এই পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে। প্রচলিত পদ্ধতিতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অল্প সময়ের ব্যবধানে ১০ থেকে ১৫ টি ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। এতে তাঁরা যেমন পরীক্ষার উপযুক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন না তেমনি অতিরিক্ত চাপে অনেকেই মানসিকভাবে বিধ্বস্থ হয়ে পড়েন। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে এই বল্গাহীন প্রতিযোগিতায় ছুটতে না পেরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে যান। এই ধরনের অবান্তর প্রতিযোগিতায় প্রকৃত মেধাবী খোঁজা একটি ব্যর্থ প্রয়াসে পরিণত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয় তাই সেখানে ভর্তির জন্য আলাদা ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থাটি অযৌক্তিক। এ নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এতদিন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব প্রতিবাদকে আমলে নেননি। এর পিছনে বিশাল অংকের ভর্তি বাণিজ্যকে অনেকে কারণ হিসাবে সামনে আনেন। কথাটি অসত্যও নয়। তবে শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনা, মানসিক যন্ত্রণা ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে এমন অনৈতিক ভর্তি বাণিজ্যটি যে চরম অমানবিক চেহারা ধারণ করেছে সেখান থেকে দ্রæত উত্তরণ ঘটানো ছিল একান্ত আবশ্যকীয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দেরিতে হলেও বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে, এজন্য তাদের ধন্যবাদ।
সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের এই সিদ্ধান্তটিকে এখন নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হতে পারে। বিশেষ করে যারা ভর্তি বাণিজ্য থেকে মুনাফা পকেটে ঢুকিয়ে অভ্যস্ত তারা তো শক্ত বাধা তৈরি করবেই। এই বাধা মোকাবিলা করে সামনের বছরে যদি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা কার্যকর করা যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশেষভাবে প্রশংসাধন্য হবে। আমরা আশা করি তারা নিজেদের সিদ্ধান্তের জায়গায় অবিচল থাকতে সক্ষম হবেন। দেশের সবগুলো মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। এখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মেডিক্যাল কলেজগুলো যদি পারে তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পারবে না এই প্রশ্ন ছিল সকলের। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসা উচিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। শিক্ষার্থীর একাডেমিক ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত স্কোর ও শিক্ষার্থীর পছন্দের ভিত্তিতে কে কোথায় ভর্তি হবে সেটি নির্ধারিত হবে। মূলত উচ্চশিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি কখনও অবাধ ও স্বেচ্ছাধীন হওয়ার বিষয় নয়। যার যে মেধা তার উচ্চতর বিকাশ সাধনই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য। গড় মেধাবী কিংবা নি¤œ মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের প্রয়োজন রয়েছে কিনা সেটিও ভেবে দেখতে হবে নীতি নির্ধারকদের। সকলকেই মাস্টার্স ডিগ্রিধারী হতে হবে, এমন চিন্তাভাবনা আধুনিক শিক্ষা দর্শনের সাথে খাপ খায় না। বরং যে যতটুকু মেধা ধারণ করে তার সেই মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোই শিক্ষা দর্শনের মূল কথা। এছাড়া দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনাযোগ্য। তাই উচ্চশিক্ষার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি আধুনিক ও জ্ঞাননির্ভর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি বলে আমরা মনে করি।
যাহোক, ভর্তি পরীক্ষার আতংক থেকে মুক্তি দিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রবর্তনের সিদ্ধান্তটি কাগজে-ফাইলে আটকা না থেকে এটি সামনের বছর থেকেই কার্যকর হোক, এই আমাদের প্রত্যাশা।