পিআইসিরা কমিশন ভোগীদের খপ্পরে

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওর রক্ষা বাঁধের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৯৬৪ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির অনেকেই মধ্যস্বত্বভোগী, চাঁদাবাজ এবং কমিশন ভোগীদের যন্ত্রণায় পড়েছেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির দায়িত্বশীলদের এঁরা (চাঁদাবাজ-কমিশন ভোগীরা) ফোন দিয়ে বলছে,‘ তোমরা বিল পেতে হলে, আমাদের সঙ্গে মিটমাট করো, না হয় বিল পাবে না।’ অন্যদিকে, কোন কোন পিআইসির সভাপতি – সম্পাদক বা সদস্যরা কাগজে বা চেকে স্বাক্ষর করলেও টাকা চোখে দেখেননি, বাঁধের কাজে তাঁদের সম্পৃক্তও করা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যস্বত্বভোগীরা ইতিমধ্যে কিছু কিছু পিআইসির (যারা কাজে অনিয়ম করেছে) কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
জামালগঞ্জের হালির হাওরের একজন পিআইসির সভাপতি নিজের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করে বললেন,‘পিআইসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাদের। কাজও যথারীতি করিয়েছি আমরা। দুবার বিলও নিয়েছি। এখন আমাদের এক নেতা (আওয়ামী লীগ নেতা) ফোন দিয়ে বলছেন, তোমাকে পিআইসির সভাপতি করেছি আমি, তুমি সকল টাকা তুলে নিয়ে গেলে, আমার সঙ্গে দেখাই করলে না। বাকী বিল তোমাকে কে দেবে?’ ঐ পিআইসির সভাপতি বললেন, ‘এই কথাগুলো আমার মোবাইলে রেকর্ড করা রয়েছে।’
দিরাই উপজেলার চাপতির হাওর পাড়ের তাড়লের
বাসিন্দা দরবেশ মিয়া একটি পিআইসির (নম্বর ১১/ঘ) সাধারণ সম্পাদক। ঐ পিআইসির সভাপতি আবিদুর রহমান চৌধুরী। দরবেশ মিয়া গতকাল (বুধবার) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, তিনি পিআইসির সদস্য সচিব হলেও প্রথম চেক উত্তোলনের পর সভাপতির ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ চৌধুরী চেকে তার স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলন করে তিনিই কাজ করাচ্ছেন। এখন দ্বিতীয় কিস্তির চেকে তিনি স্বাক্ষর দেবেন না।
আহমেদ চৌধুরী দরবেশ মিয়ার এই অভিযোগের জবাবে বলেছেন,‘দরবেশ মিয়ার ব্ল্যাক মেইলের শিকার আমি। আমার ছোট ভাই আবিদুর রহমান চৌধুরী ঐ পিআইসির সভাপতি। দরবেশ আমার মামার দোকানের কর্মচারী, তাকে পিআইসির সদস্য সচিব করেছিলাম, বাঁধের কাজ রাত দিন পরিশ্রম করে আমরা করেছি, এখন দ্বিতীয় কিস্তির চেকে স্বাক্ষর করার সময় সে বলছে, তাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে।’
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন ইকবাল বলেন,‘অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’
জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের এক পিআইসি সভাপতি বললেন,‘তারা পাউবোর প্রকৌশলীর নির্দেশনা মোতাবেক বাঁধের কাজ শেষ করেছেন। সুনামগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দিয়ে দুজন একদিন তাদের বাঁধ দেখতে গিয়েছিলেন। এখন তাঁরা (গণমাধ্যমকর্মী পরিচয়ধারীরা) বার বার ফোন দিচ্ছেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করার জন্য।’ এই চিত্র সারা জেলায়ই রয়েছে।
ধর্মপাশায় পিআইসি সভাপতি, ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এই প্রসঙ্গে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলার চামারদানী ইউনিয়নের গুরমার হাওরের ঝিনাইরা বাঁধের ৩ নম্বর পিআইসির দায়িত্বশীলরা ২৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কাজের ১৬ লাখ টাকা বিল পেয়েছেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না এখন এই টাকার ১৫ শতাংশ তাঁকে দেবার দাবি করেছেন বলে পিআইসি সভাপতি বিনয় সরকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার বললেন,‘পিআইসি সভাপতি বিনয় সরকারসহ একাধিক পিআইসির দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে ইউপি চেয়ারম্যানের কমিশন চাওয়ার বিষয়টি তারা মঙ্গলবার মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাদের কাছে কমিশন চাওয়ার কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে। আমি বলেছি, লিখিত অভিযোগ দেবার জন্য।’
ইউপি চেয়ারম্যান জাকিরুল আজাদ মান্না বলেন,‘ঝিনাইরা বাঁধ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘লাখ টাকার ধান রক্ষায় ৭৫ লাখ টাকার বাঁধ’। এই রিপোর্টে আমার বক্তব্য ছিল। উপজেলা প্রশাসন এবং পিআইসির দায়িত্বশীলরা মনে করেছেন, আমি এই রিপোর্ট করতে সাংবাদিকদের তথ্য দিয়েছি। এজন্য আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা গল্প সাজানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদরের কাংলার হাওর রক্ষা বাঁধের একজন পিআইসি সভাপতি বললেন,‘পাউবো’র একজন ইঞ্জিনিয়ার, ২-৩ জন গণমাধ্যমকর্মী, একজন নেতা ফোন দিয়ে বলেছেন বিল তাড়াতাড়ি পেতে হলে তাঁদের সঙ্গে যেন দেখা করি।’
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘ কেউ টাকা চাইলে পিঠের চামরা ওঠিয়ে যেন পুলিশে সোপর্দ করে। কমিশন বা চাঁদা চাওয়ার প্রেক্ষিতে মামলা করতে চাইলে আমরা সহযোগিতা করবো।’
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বললেন,‘ কোন পিআইসি যেন কাউকে কমিশন বা চাঁদা না দেয়। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি স্বচ্ছভাবে কাজ করতে। বিল পেতেও কোন তদবির, কমিশন বা চাঁদা কাউকে দিতে হবে না। যার যার ন্যায্য পাওনা সময়মতো পেয়ে যাবেন।’
প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জে এবার বাঁধের কাজের ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ রয়েছে। এই পর্যন্ত ১২৪ কোটি টাকা পাওয়া গেছে।’



আরো খবর