পিঞ্জিরাবদ্ধ টিয়া পাখি ও আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি

টিয়া পাখি জগতের অপূর্ব সুন্দর একটি প্রজাতি। টিয়ার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সবুজ প্রকৃতির মাঝে নিজের শরীরের সবুজ রঙ নিয়ে এই পাখিগুলো সত্যিকার অর্থেই আমাদের প্রাণ প্রকৃতির এক অপরূপ সম্ভার। দেশে একসময় প্রচুর টিয়া পাখির দেখা মিলত। গ্রামের নরম কা-বিশিষ্ট গাছে গর্ত করে আবাস তৈরি করে এরা বসবাস করত। গাছ কমছে। মানুষ উজাড় করছে বন-জঙ্গল। এর প্রতিক্রিয়া পড়ছে প্রকৃতিনির্ভর প্রাণী কূলের উপর। পাখি কমছে, বন্য জন্তু জানোয়ার কমছে। বহু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পৃথিবীটা যে মানুষের জন্য বসবাস উপযোগী হয়েছে তার পিছনে বড় অবদান এই প্রাণ-প্রকৃতির। নানা উপায়ে এরা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। মানুষের জন্য উপকারী প্রাণ প্রকৃতিকে নিষ্ঠুর মানুষরাই সাবাড় করে চলেছে প্রতিনিয়ত। এতে করে যে মানবগোষ্ঠীটি নিজের অবস্থানকেই বিপন্ন করে তুলছে সেই চিন্তা করছে না তারা। এখন বহু সংগঠন ও সরকার প্রাণ প্রকৃতি রক্ষার জন্য নানারূপ কর্মকা- পরিচালনা করছে সত্য তবে এর তেমন কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না কোথাও। এই যে টাঙুয়ার হাওরে শত কোটি টাকা ব্যয়ে হাওরের প্রাণ-প্রকৃতি টিকিয়ে রাখার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলো দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে তাতে টাঙুয়ার প্রাণপ্রাচুর্য কি বেড়েছে? বাড়ে তো নয়ই বরং প্রকল্প মেয়াদে হাওরের প্রাণ ও প্রকৃতি ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। কয়েক কোটি বছর ধরে একই ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে টাঙুয়ার হাওর সারা পৃথিবীর মধ্যে উদ্ভিজ ও প্রাণিজ বৈচিত্রের লীলাক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আসছিল সেই টাঙুয়া আজ মৃতপ্রায়। এখানে পাখি নেই, মাছ নেই, লতা-গুল্ম নেই। লোভী মানুষের লালসার শিকার হয়ে সমৃদ্ধ টাঙুয়া আজ বিবসনা হতশ্রী এক বৃদ্ধার কঙ্কাল মাত্র।
টিয়া পাখিকে বিলুপ্ত প্রজাতির পাখি ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে অল্পসংখ্যক টিয়া এখনও অবশিষ্ট আছে সেগুলোকে সযতেœ রক্ষা করার অঙ্গীকার প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে টিয়া পাখির ঐতিহ্যবাহী আবাসস্থল সদর উপজেলার শ্রীনাথপুর গ্রাম থেকে ক্রমশ যে টিয়া পাখি কমছে সে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই সংবাদেই জানা যায়, গ্রামের কিছু লোক এসব টিয়া পাখি নিজেদের বাড়িতে পিঞ্জিরাবদ্ধ করে রেখেছেন। এই পিঞ্জিরাবদ্ধ পাখিগুলো নিয়ে গ্রামবাসী কী করেন সেই তথ্য প্রতিবেদনে নেই অর্থাৎ এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলেননি। কিন্তু আমরা অনুমান করতে পারি এখানে আসলে কী হচ্ছে। অনেকে বাড়িতে শখের বসে টিয়া পাখি পোষেন। তাই বাজারে টিয়া পাখির বেশ বড় চাহিদা আছে। সিলেটে এরকম পোষা পশু-পাখির বাজারও রয়েছে। অবৈধ হলেও এই ব্যবসা সকলের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। শ্রীনাথপুরের যে ব্যক্তিরা প্রকৃতির মধ্যে বিচরণশীল টিয়া পাখি ধরে পিঞ্জিরার মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছেন তারা যে এগুলো এই বাজারেই সরবরাহ করে ভাল টাকা কামাই করছেন সেটি মোটামোটি অনুমানযোগ্য। সম্ভবত পাখি শিকারিদের এই লোভের কারণেই শ্রীনাথপুর গ্রাম থেকে সবুজ টিয়া এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ বিষয়ে বন বিভাগের এখনই কার্যকরী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। নতুবা এই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী একটি অনুষঙ্গ টিয়াপাখি চিরতরে বিলুপ্তির শিকার হতে বেশি সময় লাগবে না।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। তারা টিয়া পাখির সাথে বিরূপ আচরণ না করার জন্য সচেতন করতে পারেন সকলকে। প্রকৃতির সুন্দরকে প্রকৃতির সম্ভার করে রাখতে কিছু লোভী শিকারিদের দমন করা তেমন কঠিন কাজ নয় বলেই আমরা মনে করি।