পিটিআই’র বৈধ্যভূমি সংরক্ষণ সঠিক স্থানেই স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হোক

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় জেলার ৬টি ঐতিহাসিক স্থানের প্রতিটিতে ৩৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সরকারি অনুমোদন মিলেছে। এলজিইডি এসব স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট স্থানের অবস্থা অনুসারে প্রাক্কলন তৈরির কাজ শুরু করেছে। এসব সংরক্ষণযোগ্য চিহ্নিত জায়গাগুলো হলোÑ দক্ষিণ সুনামগঞ্জের আহসানমারা সেতু এলাকা, দিরাইর শ্যামারচর বাজার নদীর পার্শ্ব, ধর্মপাশার শহীদ আব্দুল হাই ও শহীদ মোফাজ্জল হোসেন স্মৃতিসৌধ, জামালগঞ্জের সাচনাবাজার মেমোরিয়াল, তাহিরপুরের বড়ছড়া বৈধ্যভূমি এবং জেলা সদরের পিটিআই বধ্যভূমি। এই জাতির চিরায়ত ইতিহাসে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য ঘটনা যা বাঙালির স্বাধীনতাস্পৃহাকে প্রথমবারের মত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ওই যুদ্ধ বাঙালি জাতির চিরকালীন গর্বের বিষয়। সুতরাং এই ঐতিহাসিক ঘটনার সব স্মৃতিচিহ্ন ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। জাতীয় কর্তব্য পালনের এই জায়গায় বর্তমান সরকার নিঃসন্দেহে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছে যেখানে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর নিদারুণ অবহেলা আর পরিকল্পিত ইতিহাস ভুলানোর ধূর্ত কৌশল ছিল সর্বজনবিদিত। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে সরকারের এই প্রয়াসকে আমাদের সশ্রদ্ধ অভিনন্দন।
জেলার যে ৬টি ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তার মধ্যে জেলা শহরের পিটিআই বধ্যভূমি অন্যতম। বলা যেতে পারে এই বধ্যভূমিটি ছিল জেলায় পাক হানাদার বাহিনির নৃশংস অত্যাচার-নির্যাতনের সবচাইতে বড় স্থান। এখানে নিরিহ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা করা, নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠনসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধকর্ম অবলীলায় চালিয়েছে পাক বাহিনি। সুতরাং গুরুত্বের দিক থেকে এই বৈধ্যভূমিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ আরও আগেই গ্রহণ করা উচিৎ ছিল। তবু ভাল যে অবশেষে সরকার এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আসল কথা হল, হত্যা নির্যাতনের পর পিটিআই’র যে স্থানে মরদেহ ফেলে রাখত পাক বাহিনি সেই নির্দিষ্ট স্থানটি এখন অন্য স্থাপনা দিয়ে আড়াল করে ফেলা হয়েছে। জেলা শহরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর সঠিক জায়গায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট একটি আবেদন করেছেন। এর আগে তিনি পিটিআই’র বধ্যভূমির সঠিক জায়গা চিহ্নিতকরণের কাজটি শেষ করেছিলেন। পূর্ববর্তী জেলা প্রশাসক জনাব সাবিরুল ইসলাম বধ্যভূমির সঠিক স্থান চিহ্নিত করে একটি স্ক্যাচ ম্যাপও তৈরি করিয়েছিলেন। চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া মোতাবেক প্রকৃত বধ্যভূমির উপর পিটিআইর সুপারিনটেনডেন্ট এর বাসভবন অবস্থিত। অবশ্য বাসভবনটি বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত। জনশ্রুতি রয়েছে, বধ্যভূমির উপর ভবনটি নির্মিত হওয়ায় ভয়ে এখানে কেউ থাকতে রাজি হন না।
যেকোন ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ করতে হলে সঠিকভাবেই সেটি সংরক্ষিত হওয়া উচিৎ। পিটিআইর সুপারের বাসভবনটি যে বধ্যভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত, এটি এখন প্রমাণিত। সুতরাং ওই বাসভবন ভেঙেই স্মৃতিসৌধ তৈরি করা যুক্তিসংগত। অন্য স্থানে স্মৃতিসৌধ করার অর্থ হবে ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করে রাখা। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর সঠিক জায়গায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের যে আবেদন করেছেন সেটি যুক্তিসংগত বলেই আমরা মনে করি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তড়িৎ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। তবে এসব জটিলতায় যাতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের বিষয়টিই আবার ঝুলে না পড়ে সে দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।