পিটিআই বধ্যভূমির জায়গা উদ্ধারের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার
একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনি কর্তৃক সুনামগঞ্জের আলোচিত গণহত্যাস্থলসমূহ ও শহরের পিটিআই বধ্যভূমির মূল জায়গা উদ্ধারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সদস্য সচিব মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর।
লিখিত আবেদনে মালেক হুসেন পীর উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ক্যাপ্টেন মাহবুব এর নেতৃত্বে ১১ জন পাক হানাদার বাহিনী সুনামগঞ্জে এসে আতঙ্ক তৈরি করে। তারা সুনামগঞ্জ সদর থানা দখল করে রাতে সার্কিট হাউজে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। ২৮ মার্চ সকাল ১০ টায় সার্কিট হাউজে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ চালান মুক্তিযোদ্ধা জনতা। সারা দিন ও রাত উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। রাতভর বৃষ্টির কারণে শেষ রাতে দুইজন জীবিত ও একজন আহত পাকিস্তানী সেনাকে রেখে অন্যরা পলায়ন করে। এর পরেই সুনামগঞ্জ প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনিষ্টিটিউটে (পিটিআই) মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপিত হয়। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ১০ মে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় বিপুল শক্তি সঞ্চয় করে উন্নত অস্ত্র নিয়ে আবারো শহরে প্রবেশ করে। পরে পিটিআই ক্যাম্পাসে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প দখল করে টর্চারসেল প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানি খান সেনারা।
এই সময়ে স্থানীয় দালাল, রাজাকার, আল বদরদের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে পিটিআই হোস্টেলের নীচতলার পূর্ব দিকের একটি কক্ষে রেখে চরম নির্যাতন করতো। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে হিন্দু, মুসলিমসহ মুক্তিকামী বাঙালি-নারী পুরুষদের ধরে এনে পিটিআই-এ রেখে নির্যাতন করে হত্যা করা হত। নারীদের উপর সংঘবদ্ধ পাশবিক নির্যাতন চালাতো। দূর থেকে এই টর্চারশেলের নারকীয় উল্লাস ও নির্যাতিতদের আর্তচিৎকার শুনতে পেতেন সাধারণ মানুষ। নির্যাতনে যারা মারা যেতেন জল্লাদরা ক্যাম্পের পশ্চিম দিকে অবস্থিত পিটিআই হোস্টেলের পুকুরের পশ্চিমের খালি জায়গায় লাশ মাটিচাপা দিয়ে রাখতো। ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ত্রিমুখি আক্রমণ করে হটিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। পিটিআই ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যায় তারা। এরপর পিটিআই স্কুলে পুনরায় ক্যাম্প স্থাপন করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
তখন স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা ওই বধ্যভূমির মাটি খুঁড়ে প্রায় ৫০-৬০টি মাথার খুলিসহ শহীদদের হাড় গোড় উদ্ধার করেন। এই হাড়ের স্তুপের মধ্যে মহিলাদের চুল, ব্লাউজ, পেটিকোট, অন্তর্বাসসহ নানা বস্তুও উদ্ধার করেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী টর্চার সেলে নিয়মিত নারী ধর্ষণ করে তাদের হত্যা করে লাশ মাটিতে পুতে ফেলত বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরই এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধারা।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর পিটিআই বধ্যভূমিটি সংস্কারের বদলে এর স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে স্বাধীনতা বিরোধীরা। ১৯৯২ সালে স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত মহল বধ্যভূমির উপর পিটিআই’র সুপারইনটেন্টেন্ড এর পাকা বাসভবন নির্মাণ করে আলামত মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়। বর্তমান অধ্যক্ষের বাসভবনটি বধ্যভূমির উপরে অবস্থিত। এদিকে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা এর প্রতিবাদ করলে সংশ্লিষ্টরা কৌশলে মূল বধ্যভূমির পূর্ব দিকে আরেকটি জায়গাকে বধ্যভূমি দেখিয়ে সংরক্ষণ করে।
আবেদনে মালেক হুসেন পীর উল্লেখ করেন, সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। পিটিআইসহ জেলার ৬টি ঐতিহাসিক যুদ্ধ স্মৃতির স্থান সংরক্ষণের জন্য স্মৃতিসৌধ নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। এই সংবাদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি তার বন্ধু জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান ও সদর ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আতিকুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে পিটিআই বধ্যভূমিতে প্রাক্তন জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলামের মাধ্যমে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপনসহ বধ্যভূমির প্রকৃত অবস্থানের একটি স্ক্যাচম্যাপ তৈরি করান। যা ১৪৪ নং জে.এল. এর তেঘরিয়া মৌজার ১৬০৪ নম্বর খতিয়ানের ১৪৮৯ দাগের ০.২৫ একর ভূমিতে অবস্থিত । মূল বধ্যভূমিতে বর্তমানে বর্তমানে একটি পাকা পরিত্যক্ত বাসভবন রয়েছে। এই ভূমি এল.এ. কেইস নং- ৩৩/৬২-৬৩ইং মূলে অধিগ্রহণ করায় বর্তমানে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে আছে।
মালেক হুসেন পীর মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমির উপর থেকে পুরনো ভবন অপসারণ করে সঠিক স্থানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ইকবাল আহমদ বলেন,‘ মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীরের আবেদনের অনুলিপি পেয়েছি। বিষয়টির খোঁজ-খবর নেয়া হবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথেও আমরা কথা বলব।’