পুরোনো মহাজনি প্রথাই কি ফিরে আসবে?

সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রেতা কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে ধানের মূল্য পরিশোধ করা হয়। ব্যাংক সেই টাকা থেকে তাদের পাওনা কৃষি ঋণের টাকা কেটে রাখেন। এমন একটি বাস্তবতা নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন কৃষকের বক্তব্য থেকে জানা যায়, এ কারণে তারা বিপাকে পড়েছেন। বিপাকে কেন? তারা কি ঋণ পরিশোধ করতে চান না? বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেছেন, ওই উপজেলার কৃষি ঋণ কমিটির সভায় ব্যাংক ম্যানেজারদের এ বিষয়ে একটু নমনীয় মনোভাব পোষণ অর্থাৎ জোর করে টাকা না কেটে বুঝিয়ে যতটুকু সম্ভব ঋণের টাকা আদায় করার অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক পরিষ্কার জানিয়েছেন, পাওনা টাকা আদায়ের অধিকার ব্যাংকের আছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ছাড়া আর কারও অনুরোধে ঋণ আদায় বন্ধ রাখতে ব্যাংকের কোন শাখাই বাধ্য নয় বলে তিনি সাফ জানিয়েছেন। এমন অনড় অবস্থার কারণে বিভিন্ন জায়গায় সামান্য কিছু কৃষক ঋণ পরিশোধের নৈতিক দায় পালন করতে যেয়ে কিছুটা বিপাকে পড়বেন সত্য। কিন্তু মাঠের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় নিলে এই বিপাক খুব বেশি কৃষকের উপর না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ হলো, খুব সামান্য সংখ্যক কৃষক যৎসামান্য ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছেন। যে কৃষকদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, সেখানেও মধ্যস্বত্বভোগী স্থানীয় প্রভাবশালীদের এক ধরনের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অর্থাৎ কৃষকদের নিকট থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করে মূলত তাদের নামে প্রভাবশালীরাই ধান গুদামে দিচ্ছেন। সমস্যা মূলত ওই প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগীদের। সমস্যা বরং অন্য জায়গায়। সরকারি গুদামে চাহিদা মত ধান বিক্রি করার সুযোগ না পেয়ে এবং এর কুপ্রভাবে বাজারে ধানের অত্যধিক নি¤œমূল্য বিদ্যমান থাকায় প্রকৃত কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। কৃষি ঋণ আদায়ের কারণে প্রকৃত কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন, আংশিকভাবে এটি সত্য হলেও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেই আমরা মনে করি।
অন্যদিকে, কোন কৃষক যদি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করেন তাহলে সেই ঋণ পরিশোধ তো করতেই হবে। বাংলাদেশে বিশেষ করে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ না করার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে ক্রমশ অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। একসময় কৃষকরা চাষাবাদের জন্য মহাজনি শোষণমূলক ঋণজালে আবদ্ধ ছিলেন। উচ্চসুদে সেই ঋণ গ্রহণ করতে হতো। এবং খাতককে মহাজনের অমানবিক চাপের কারণে সময়মতো সেই ঋণ পরিশোধও করতে হতো। সরকার যখন নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মহাজনি ঋণের জাল থেকে কৃষক ও নি¤œবিত্তদের বের করে আনলেন, তখন এই ঋণ পরিশোধ না করার সংস্কৃতি আবারও কৃষক ও নি¤œবিত্ত জনগোষ্ঠীকে পুরোনো মহাজনি ঋণ প্রথায়ই ফিরিয়ে নিচ্ছে কিনা সেই চিন্তা ঋণগ্রহীতাদেরই করতে হবে।
প্রচলিত নিয়মে যখন কেউ ঋণ পরিশোধ করে না তখনই অস্বাভাবিক পথ অনুসরণ করা হয় যা ব্যাংকগুলো এখন করছে। এ কথা সত্য যে, একসময় কৃষি ঋণ বিতরণে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তৃতি ছিল। এখনও এই অভিশাপ থেকে আমরা মুক্ত নই পুরোপুরি। তবে কমেছে। কৃষকরা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করলে পুনরায় বর্ধিত হারে ঋণ পাবেন। প্রতি বছরই তারা চাষাবাদ মৌসুমে ঋণ নিতে পারেন। কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানই ঋণ পরিশোধকারী খাতককে নতুন ঋণ দিতে অসম্মতি দেখায় বলে আমাদের জানা নেই। তবে কিছু অসৎ দালাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে অনৈতিক সংশ্রব রক্ষা করে এই প্রক্রিয়াকে কলুষিত করেছে। এদেরও প্রতিহত করতে হবে।