পুরোনো সার্কিট হাউস অত্রাঞ্চলে স্বাধীনতার প্রতীক

জেলার পুরাতন সার্কিট হাউসকে সংরক্ষণের দাবি উঠেছে বিশিষ্টজনদের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান সুনামগঞ্জের সুসন্তান কবি ড. মোহাম্মদ সাদিক ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটিকে সংরক্ষণ পূর্বক একে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আধা সরকারি পত্র পাঠিয়েছেন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবর থেকে বুঝা যায় এই দাবির সাথে জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একমত রয়েছেন। আমরা জানি বৃটিশ শাসনামলে নির্মিত এই সার্কিট হাউসটি সরকারি উচ্চ পদস্তদের সাময়িক অবস্থানের জন্য নির্মিত করা হয়েছিলো। মূলত বৃটিশ শাসনকে তৃণমূলে সুদৃঢ়করণে অপরাপর আয়োজনের সাথে এই সার্কিট হাউসটিও গড়ে উঠে। শহরের এক প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলা সুরমা নদীর সামনে এই সরকারি আবাসিক ভবনটির অবস্থান। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলি অনুসরণে কাঠের পাটাতনের উপর স্থাপিত টিনের এই এক তলা ভবনটি নান্দনিক শোভার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। সার্কিট হাউসের সামনে পিছনে ও দুই পাশে প্রচুর খালি জায়গা রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে তৎকালীন মহকুমা শহর সুনামগঞ্জের অন্যতম একটি ভবন ছিল এই সার্কিট হাউস। ব্রিটিশ শাসন কাল থেকে পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের নব্বই দশক পর্যন্ত এই সার্কিট হাউসটি উচ্চপদস্ত সরকারি পদবিধারী ও আমলাদের সেবায় নিয়োজিত থেকে এটি এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ঐতিহ্যের নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। এখন নতুন সার্কিট হাউস নির্মিত হয়েছে। প্রয়োজন ফুরিয়েছে পুরাতনটির। এখন এটি অনাদরণীয়। তাই এর শ্রী হানি ঘটছে। একদা সৌন্দর্যময় এই স্থাপনা সংস্কার আর মনোযোগের অভাবে এখন জীর্ণ হতে চলেছে। হয়তো আরও কিছুদিন গেলে এটি একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠবে। এর আগেই ঐতিহাসিক এই ভবনটির কোনো বন্দোবস্ত হলে শহরের একটি পুরোনো নিদর্শন অন্তত কালের বক্ষে বিলীন হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।
সার্কিট হাউসটির অনন্যতা তৈরি হয় মুক্তিযুদ্ধ কালে । পাক বাহিনির প্রথম সামরিক দলটি বাঙালি ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে শহরে এসে এই সার্কিট হাউসেই আস্তানা গাঁড়ে। স্বভাবতই স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালির ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠে তখন এটি। পাকিস্তানি সামরিক প্রস্তুতির বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধটি সংঘটিত হয় এই সার্কিট হাউসকে ঘিরেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই প্রথম প্রহরে ২৭ মার্চ এই অঞ্চলের বীর জনতা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে সার্কিট হাউস। সাধারণ জনতার পাশাপাশি অস্ত্র হাতে ওই প্রতিরোধে যোগ দেন কিছু আনসার সদস্যও। এদেরই একটি দল এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থান নিয়ে সার্কিট হাউস লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করতে শুরু করে। পাকবাহিনিও পালটা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। পাক হানাদারদের ছোঁড়া একটি গুলি বিদ্ধ হয় বালিকা বিদ্যালয়ে অ্যামবুশে থাকা আনসার সদস্য আবুল হোসেনের শরীরে। তাৎক্ষণিক শহীদ হন তিনি। এর আগে একটি মিছিল জুবিলী স্কুলের সামনে দিয়ে সার্কিট হাউস অতিক্রমকালে গুলিবিদ্ধ হন বিকশাওয়ালা গনেশ। প্রতিরোধের প্রথম দিনেই সার্কিট হাউস থেকে পাক বাহিনির ধেয়ে আসা গুলিতে শহীদ হন এই দুই অকুতোভয় বীর বাঙালি। মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতি পুরাতন সার্কিট হাউসটিকে সরাসরি স্বাধীনতার একটি প্রতীকে পরিণত করেছে। জেলার প্রথম প্রতিরোধের স্বাক্ষী এই সার্কিট হাউসকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রূপান্তরের দাবিটি তাই অতিশয় যৌক্তিক।
আমরা আশা করব ড. মোহাম্মদ সাদিকসহ জেলার বিশিষ্টজনদের অভিপ্রায়কে সম্মান জানিয়ে সরকার এই পুরোনো সার্কিট হাউসটিকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রূপান্তরের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার মতো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এর প্রতিটি স্মৃতিচিহ্ন এই জাতির অহংকারের অস্তিত্ব। এইসব অহংকারকে বাঁচিয়েই আমাদের স্বাধীনতাকে অমরত্ব দিতে হবে।