পুলিশের একটি প্রজন্মকে নৈতিকতার শিক্ষা দিলেন পুলিশ সুপার

সুনামগঞ্জ জেলায় পুলিশ কনস্টেবল পদে ২৫৬ ব্যক্তি নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর সময় জেলার পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়েছিলেন এই নিয়োগে কোন ধরনের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না, আবেদনকারীগণ ১০০ টাকা ফিস জমা দিয়ে আবেদন করবেন, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছভাবে নিয়োগ চূড়ান্ত হবে, কাউকে কোন টাকা দেয়া লাগবে না। তিনি সেদিন হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন, কেউ যাতে চাকুরি পাইয়ে দেয়ার নাম করে কারও কাছ থেকে টাকা গ্রহণ না করে। এরকম অপকর্মের বিরুদ্ধে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রাখার কথাও সেদিন পুলিশ সুপার বলেছিলেন। অবশেষে বৃহস্পতিবার আবারও সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ সুপার চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেছেন। শেষ সংবাদ সম্মেলনে কেমন পরিস্থিতিতে তিনি ও তার সহযোগীরা এই কঠিন কাজটি শেষ করেছেন তার কিছু অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেছেন। আমরা জানি, স্থানীয় নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোতে প্রভাবশালীদের তদবিরের একটি চাপ থাকে। সমাজে এমন বহু লোক রয়েছেন যারা এমন নিয়োগকে বাণিজ্যের উপলক্ষ বানিয়ে ফেলতে ওস্তাদ। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এমন অনৈতিক তৎপরতাকে উৎসাহ দিতে দেখেছি আমরা। সাধারণ মানুষ স্থানীয় নিয়োগগুলো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হতে পারে, বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিলেন। এরকম অবস্থায় স্বচ্ছতার সাথে কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা সুকঠিন কাজ বৈকি। অবশেষে সব ধরনের চাপ, প্রলোভন ও তদবির উপেক্ষা করতে পেরেছেন বলে স্বয়ং পুলিশ সুপার নিজেই জানিয়েছেন। ভিতরে কোন ধরনের গুমর থাকলে জনসম্মুখে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ সহজ নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে কোনো পর্যায়ে কোনো আবেদনকারী কিংবা তাদের অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সুতরাং পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার দিক দিয়ে যে একটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কৃতিত্বের দাবিদার পুলিশ সুপার। তাঁকে আমাদের অভিনন্দন।
পুলিশের সম্পর্কে সর্বমহলের একটি নেতিবাচক ধারণা বিদ্যমান। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এই বাহিনির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মূলত পুলিশ যে ধরনের দায়িত্ব পালন করে সেখানে তাঁদের সর্বাবস্থায় জামা কাপড় সাফসুতরো রাখা সম্ভব হয় না। পুলিশের নানা পদক্ষেপ বহু জনের বিপক্ষে যায়। যাদের বিপক্ষে যায় তারা পুলিশের সম্পর্কে অপপ্রচার করে। আবার পুলিশের কিছু লোকও দুর্নীতির সাথে জড়িত। পুলিশ বাহিনি সবসময় নিরপেক্ষ ও চাপমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ পায় না। আবার এই পুলিশেরই বহু মানবিক কর্মকা-ের উদাহরণ আমাদের জানা। কত ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করেন সকলে তা কল্পনাও করতে পারবে না। জাতীয় প্রেক্ষাপটে পুলিশের অর্জন কম কিছু নয়। নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের এখনও শেষ ভরসার জায়গা পুলিশ। মূলত পুলিশের উপর যদি মানুষের আস্থা না থাকে তাহলে ওই সমাজে অপরাধ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের সমাজটি যে এখনও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারেনি তার পিছনে পুলিশ বাহিনির ভূমিকা কম কিছু নয়। সবকিছু মিলিয়েই আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনির যে পরিচয়, সুনামগঞ্জের পুলিশও তার বাইরের কোন অস্তিত্ব নয়। কনস্টেবল নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চয়ই সুনামগঞ্জের পুলিশ বাহিনির ভাবমূর্তিকে অনেকখানি উজ্জ্বল করে তুলবে।
যারা বিনা পয়সার চাকুরি পেয়েছে, সেই কনস্টেবল নারী-পুরুষরা এদেশের প্রান্তিক পরিবারগুলোর সন্তান। তাদের অনেকেরই টাকা দিয়ে চাকুরি লাভ করার সামর্থ নেই। যারা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকুরি পেলেন, তারা নিজেদের চাকুরি জীবনে এই অভিজ্ঞতা স্মরণে রাখবেন এবং কর্মক্ষেত্রে এই আদর্শকে ধারণ করবেন। এভাবেই পুলিশের একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিকতার শিক্ষা দিলেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো: বরকতুল্লাহ খান। তাঁকে আবারও অভিনন্দন।