পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ-স্বপনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো

স্টাফ রিপোর্টার
স্বপন রবি দাসের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে শহরের পুলিশ লাইনস মাঠে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ২৫৫ জন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের ফলাফল ঘোষণার সময় মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম অন্যান্যদের সঙ্গে স্বপন রবি দাসের উত্তীর্ণের কথা জানিয়ে রোল ও নাম ঘোষণা করেন। খুশিতে আত্মহারা স্বপনের চোখ দিয়ে তাৎক্ষণিক অঝোর ধারায় চোখের পানি পড়তে থাকে। পরে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ্ খান কনস্টেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে আগ্রহীদের সাংবাদিকেদের সামনে অনুভূতি প্রকাশের আহ্বান জানান।
স্বপন রাব দাস তখন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। স্বপন রবি দাস এসময় নিজের পারিবারিক অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে বলে, কখনো নৌকায় দিনমজুরের কাজ আবার কখনো জুতা সেলাইয়ের কাজ করেছি। একই সঙ্গে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সুরমা স্কুল এন্ড কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশুনা করি। সে জানায়, ছোটকাল থেকেই পুলিশের চাকুরি ছিল স্বপ্ন। তার বাড়ি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের গণিগঞ্জ গ্রামে। পিতা বাশি রাম রবি দাস ও মা ময়নামতি রাণী রবি দাস।
বাশি রাম রবি দাস গণিগঞ্জ বাজরে ফুটপাতে বসে মুচির কাজ করেন। তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে চতুর্থ স্বপন।
সকলের সামনে বক্তব্য দেবার সময় স্বপন বলে, চাকরি পাওয়ায় নতুন ভাবে বাঁচার সুযোগ তৈরি হয়েছে, এই চাকরি কেবল তার নয়, তার পুরো পরিবারের সামাজিক অবস্থান বদলে যাবে।
সে কৃতজ্ঞতা জানায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান’র প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানায় সে।
শনিবার সকাল ৮ টায় পূর্ব নির্ধারিত নোটিশ অনুযায়ী পুলিশ লাইনস্ েমেডিকেল করাতে আসে সে। এসময় দায়িত্বশীলরা জানান, সে অপেক্ষামাণ তালিকায় আছে।
স্বপন বললো, ‘আমার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়েছে, মনে হয়েছে, আমি কোথায় ভুল করলাম, সকলের সামনে মুচির ছেলে পরিচয় দিয়ে ভুল করলাম কী-না?’
শনিবার বিকাল ৫ টায় স্বপন এ প্রতিবেদককে বললো, ‘সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সুপার সাহেবকে বিষয়টি জানাই আমি, আমি পুলিশ সুপার সাহেবকে বলি আমার নাম ও রোল ফলাফলের সময় ঘোষণা হয়েছে। অপেক্ষামাণের লাইনে আমাকে দাঁড়ও করানো হয়নি। যারা উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের লাইনে রাখা হয়েছে আমাকে। চাকরির আবেদনের সময় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী’র তালিকায় আমি একাই ছিলাম। সার্কুলারে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর কোটা ছিল। এই হিসাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সনদও আমার দেওয়া ছিল। কিন্তু উপজাতীয় কোটায় সংযুক্ত করা হয় আমায়, উপজাতীয় ২ জনের চাকরি হয়েছে। আমাকে এক নম্বর অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এই দুইজনের কেউ চাকরি না করলে, আমার চাকরি হবে বলে বলা হচ্ছে। এলাকার সংসদ সদস্য মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছি আমি, তিনি বলেছেন, কাল তিনি এলাকায় আসবেন, দায়িত্বশীলদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইবেন।’
এদিকে, মুচির ছেলে স্বপন রবি দাসের পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার পায়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশিরভাগেই ইতিবাচকভাবে নেন এবং সেভাবে যার যার আইডিতে মন্তব্যও করেন। সুনামগঞ্জের স্থানীয় একটি দৈনিকে এই নিয়ে ইতিবাচক সংবাদও প্রকাশ পায়। কিন্তু শনিবার সবই গুড়েবালি হয়ে যায়।
পুুলিশ সুপার বরকতুল্লাহ্ খান’এর কাছে শনিবার বিকালে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বপন রবি দাসের নাম অপেক্ষমাণ হিসাবেই ঘোষণা হয়। ফলাফল ঘোষণা’র সময় সে নিজে থেকেই আগ্রহী হয়ে বক্তব্য দেয়। শনিবার সে আমার কাছেও এসে কান্নাকাটি করেছে। আমার নিজেরও খুব খারাপ লেগেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া এতো স্বচ্ছভাবে হয়েছে, এখানে ফলাফলসীট বদলানোর কোন সুযোগই কারও নেই। সে যেহেতু এক নম্বর অপেক্ষমাণ, সুতরাং একজন চাকরিতে যোগদান না করলেই তার চাকরি হবে।
প্রসঙ্গত. সুনামগঞ্জে বৃহস্পতিবার পরীক্ষা শেষে ২৫৫ জন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ কোটায় পুরুষ ১২৩ জন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুরুষ ৭২ জন, নারী সাধারণ কোটায় ৪৫ জন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নারী ৭ জন, পুলিশ পোষ্য ৩ জন, উপজাতি ২ জন, আনসার ৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।