পেরুয়া-শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞ-১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত পেরুয়া-শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞে জড়িত ১১ অপরাধির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে এ তদন্ত প্রতিবেদনের সার সংক্ষেপ তুলে ধরেন তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক মো. আবদুল হান্নান খান।
তিনি জানান, এটি তদন্ত সংস্থার ৭১ তম প্রতিবেদন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১১ আসামীর মধ্যে ৬ জন গ্রেফতার হয়েছে। বাকি ৫ জন পলাতক।
গ্রেফতারকৃত ছয় জন হলেন, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দৌলতপুরের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মোহাম্মদ জুবায়ের মনির (৬২), একই উপজেলার ঘুংগিয়ারগাঁও এলাকার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন (৬২), শশারকান্দা এলাকার মো. সিদ্দিকুর রহমান (৬১), উজানগাঁও এলাকার মো. তোতা মিয়া টেইলার (৮১), দিরাই উপজেলার শ্যামারচর পশ্চিম দৌলতপুর এলাকার মো. আব্দুল জলিল (৭১) এবং মো. আব্দুর রশিদ (৬০)। পলাতক ৫ জনের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এই ১১ জনের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১২ মার্চ থেকে তদন্ত শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অপহরণ, ধর্ষণ, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ৩৪ জনকে হত্যা, কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা, আনুমানিক ৩০ টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ৩১ জনকে অপহরণ ও ১৪ জনকে নির্যাতন।
আসামীদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ২১ মার্চ তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন নূর হোসেন। তদন্ত শেষে আসামীদের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগে তিনটি ভলিয়মে মোট ১৫০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৩৩ জনকে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা নূর হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, আগামীকাল মঙ্গলবার তদন্ত সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চীফ প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও রেজিয়া সুলতানা চমনের কাছে এই প্রতিবেদন তুলে দেওয়া হবে। অফিস সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় আজ তদন্ত প্রতিবেদন তুলে দেওয়া যায়নি। গ্রেফতার যাদের করা যায়নি, তাদের নাম আপাতত কৌশলগত কারণে প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত. মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সুনামগঞ্জ জেলায় পাক হায়েনা ও তাদের সহযোগী বাঙালি দালালরা যে কয়েকটি বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করেছিল, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দিরাই উপজেলার পেরুয়া শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞ। এখানে অসংখ্য নিরীহ বাঙালি গণহত্যার শিকার হন। এরমধ্যে ২০ জনের পরিচয় মিলেছিল। কয়েক’শ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য মা-বোনেরা। এই এলাকার কয়েকজন বীরঙ্গনা এখনো জীবিত রয়েছেন।
এই ধংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এলাকার সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসাবে পরিচিত ‘পেরুয়া বড়বাড়ি’। পেরুয়া বড়বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেওয়া হয়েছিল। এই বাড়ির হেমচন্দ্র রায় এবং চিত্তরঞ্জন রায় গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। এই গণহত্যা এবং পৈশাচিক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী কয়েকজন এখনো জীবিত রয়েছেন। এই ঘটনায় গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। মামলার তদন্ত কার্যক্রম গত বছরের ২রা জুন থেকে শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ২২ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও রেজিয়া সুলতানা সরেজমিনে এসে দিনভর স্থানীয় লোকজনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন।