পৌর এলাকায় পানির সংকট, কোন কোন এলাকার পানির পাইপ দিয়ে ময়লা বের হয়

শহরের উত্তম লাল কলোনীর পেছনে নির্মিতব্য পানির ট্যাংকির কাজ চলছে ধীরগতিতে -ছবি: সু.খবর

পুলক রাজ
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পৌর এলাকায় পানির সংকটে চরম ভোগান্তিতে আছেন নাগরিকরা। পৌরসভার ষোলঘর, হাছননগর, জামতলা, দক্ষিণ আরপিননগর, উত্তর আরপিননগর, হাজীপাড়া, তেঘরিয়া, উকিলপাড়া, দক্ষিণ নতুনপাড়া এলাকায় চরম পানি সংকটে। আবার যেসব এলাকার বাসিন্দারা পানি পাচ্ছেন, তাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ না থাকায় দুর্ভোগে দিন কাটছে মানুষের। পৌর এলাকায় দুটি নতুন ট্যাংকি নির্মাণ শুরু হলেও, এর কাজ চলছে ধীরগতিতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার সরবরাহ লাইনে যে পানি সরবরাহ করা হয় কোন কোন এলাকায় তা অত্যন্ত নোংরা ও ময়লাযুক্ত। পানির সাথে কেঁচু, ময়লা চলে আসে। কোথাও কোথাও হয়তো পানির পাইপ ভেঙে ড্রেনের পানির সঙ্গে মিশে গেছে। এতে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন কোন কোন এলাকার বাসিন্দারা। কেউ নদী থেকে আবার অনেককে দূর দূরান্তের নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সেখানে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘক্ষণ। পৌরবাসী সমস্যা সমাধানে দ্রুত পৌর মেয়রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উকিল পাড়ার বাসিন্দা তৃণা দে বলেন, গত এক বছর ধরে সাপ্লাইয়ের পানির সাথে ড্রেনের পানি আসছে। পানির সাথে কেঁচু চলে আসে। ড্রেনের ময়লা পানির কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে আছি আমরা। পৌর মেয়রের কাছে অনুরোধ, আমরা যেন বিশুদ্ধ পানি পাই।
দক্ষিণ নতুন পাড়ার বাসিন্দা প্রিয়াংকা কর প্রিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় সাপ্লাইয়ের পানির সংকট খুবই বেশি। বিগত দুই বছর ধরে পানির সমস্যায় ভুগছি। নতুনপাড়ায় প্রত্যেকের বাসায় পানির সমস্যা রয়েছে। কিছুদিন আগে পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছিল, অবৈধ মটর ব্যবহার না করার জন্য। আমার অনুরোধ, মেয়র মহোদয় যেন প্রত্যেকের বাসায় তদন্ত করে মটর ব্যবহারকারীদের সনাক্ত করেন। একজনের জন্য ৫০ জন কষ্ট করতে পারে না।
জামতলা’র বাসিন্দা ইকবাল আহমেদ ছোটন বলেন, পৌরসভার প্রাপ্ত পানির সরবরাহ ব্যবস্থা খুবই করুণ। পানি দিনে দুই বেলা গ্রাহকদের সরবরাহের কথা থাকলেও, নামে মাত্র সরবরাহ হয়। কিন্তু মাস গেলে বিল ঠিকই দিতে হয়।
দক্ষিণ আরপিননগরের বাসিন্দা আক্তার হোসেন বলেন, আমাদের এলাকায় পানির সংকট আছে। প্রতিদিন স্বল্প পানি আসে। পৌর মেয়রের কাছে পানির ভালো ব্যবস্থা চাই আমরা।
হাজীপাড়ার বাসিন্দা রুহল আমিন বলেন, পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। পানি কম আসে। অনেক দিন পানির জন্য অপেক্ষা করতে করতে পাশের ঘর থেকে পানি এনে ব্যবহার করে থাকি।
তেঘরিয়ার বাসিন্দা দিলু বেগম বলেন, ‘আজকে তিন দিনে পানি আইছে। ৩০ মিনিটের মাঝে পানি গেছেগি। ইলা অইলে, আমরা কিতা করমু কইন? ফুনছি নতুন ট্যাংকি বুলে চালু করব। দেড় বছর ধইরা শুইন্যা আইরাম, কিন্তু চালু করের কই।’
তেঘরিয়ার বাসিন্দা সোহেল মিয়া বলেন, পৌরসভার সাপ্লাইয়ের পাইপ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে পানি আসে। পরিবারে অনেক কাজ থাকে, পানি না থাকলে তো সমস্যা হয়। যার বাড়িতে নলকূপ আছে, তাদের কাছ থেকে পানি আনতে হয়।
উত্তর আরপিননগরের বাসিন্দা ফয়ছল আহমেদ বলেন, ‘পৌরসভার সাপ্লাইয়ে পানি আসে না। মাসের শেষে বিলের কাগজ নিয়ে হাজির হয় পৌরসভার স্টাফ। পৌর মেয়র মহোদয়ের কাছে আমার অনুরোধ, পানির লাইন ঠিক করেন, নতুন ভালো পাইপ লাগান। নতুন ট্যাংকি চালু করে জনগণকে শান্তিতে রাখেন ।’
হাছননগরের শান্তিবাগ রোডের বাসিন্দা নরেন ভট্টাচার্য বলেন, পৌর এলাকায় পানির সংকট তীব্র। পৌরসভার যে লাইন আছে, সেই লাইনে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি সময়ে সময়ে পাওয়া যায় না। শীতের সময় দেখা যায় পৌরসভা ঠিকভাবে সার্ভিস দিতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে প্রয়াত পৌর মেয়র আয়ুব বখত জগলুল যে প্রজেক্টটি এনেছিলেন, সেই প্রজেক্টটি যদি যথাযথভাবে পৌর কর্তৃপক্ষ চালু করতে পারেন, তাহলে সুনামগঞ্জ পৌরসভার পানি সমস্যার সমাধান হবে ।
উকিলপাড়ার বাসিন্দা বিকাশ রঞ্জন চৌধুরী বলেন, পৌর এলাকার সাপ্লাইয়ের লাইনে অনেক সমস্যা আছে। অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে, তাই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানি ছাড়া মানুষ অচল। নতুন পানির পাইপ যদি লাগানো হয় এবং নতুন ট্যাংকিটা যদি দ্রুত চালু হয়, আমার মনে হয় এই সমস্যার সমাধান হবে।
ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা-আইনজীবী বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ষোলঘর পয়েন্ট থেকে নদীরপাড় পর্যন্ত পানির পাইপ ভেঙে ড্রেনের সাথে মিশে গেছে। তাই পানির সাথে ময়লা আবর্জনা চলে আসে। নোংরা পানি ব্যবহার করে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এলাকার মানুষ এই পানি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছেন। পৌর মেয়রের কাছে আমরা দ্রুত নতুন পানির ট্যাংকি চালু করার দাবি জানাই।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম বলেন, ড্রেনের পানিতে হাজার হাজার ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া থাকে। পানির পাইপের সাথে ড্রেনের পানি মিশে গেলে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে মানুষ। এই পানি ব্যবহার করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, পোলিও, হেপাটাইটিস এ ও ই, টাইপয়েড, প্যারাটাইপয়েড সহ বিভিন্ন রোগব্যাধি হতে পারে। পৌরসভাকে যেমন সচেতনতার সঙ্গে সাপ্লাইয়ের পানি সরবরাহ করতে হবে তেমনি যারা সাপ্লাইয়ের পানি ব্যবহার করেন, তাদেরকেও প্রতিদিন পানির পাইপ পরিস্কার করে পানি সংগ্রহ করতে হবে।
পৌরসভা পানি সরবরাহ শাখার তত্ত্বাবধায়ক বজলুল হক বলেন, পৌর এলাকায় প্রায় ৩২ লাখ লিটার পানি দিনে দুইবার সরবরাহ করা হয়। নতুন ট্যাংকির কিছু কাজ বাকি রয়েছে। পৌর এলাকায় ২০ কি.মি. নতুন পানির পাইপ লাইন লাগানোর বাকি রয়েছে। এই কাজ শেষ করা গেলে ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে নতুন ট্যাংকি চালু করা যাবে। নতুন ট্যাংকির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, পৌরসভার যেসব এলাকায় পানির বেশী সংকট সেই এলাকায় ২৫ টি ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে।
তিনি জানালেন, যারা সাপ্লাইয়ের পাইপ লাইনে মটর লাগিয়েছেন, তাদের বাড়িতে অভিযান চালানো হবে। সব কয়টা সাপ্লাইয়ের লাইনের সঙ্গে মটর সংযুক্ত রয়েছে। মটর জব্দ করে এনে লিস্ট করা হবে। এছাড়াও শহরের ভিতরে বেশি ওজনের ট্রাক চলে আসে, এ কারণে পানির পাইপে ফাটল ধরেছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত জানালেন, পৌরসভার পানি সরবরাহের ক্ষমতার চেয়ে পানি ব্যবহারকারী’র সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি সব সময় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় বাধ্য হয়ে সেবা গ্রহিতা জনগণকে নতুন লাইন দিতে হয়েছে। পানির নতুন লাইন দেবার সময় পানি পাওয়া যাবে না বলার পরও অনেকে সংযোগ নিয়েছেন। নতুন ট্যাংকি থেকে পানি সরবরাহ শুরু হলে এই সমস্যা থাকবে না। প্রয়াত পৌর মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুলের প্রচেষ্টায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিপ্তরের মাধ্যমে যে প্রকল্পটির কাজ হচ্ছে, সেটি হস্তান্তরের জন্য আমি বার বারই তাগাদা দিচ্ছি, তারা (জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ) কাজ করছেন, কিন্তু ধীর গতিতে। ইতিপূর্বে তারা সময় চেয়েছিলেন দুই মাস, সেই সময় শেষ হয়েছে। আমি আবারও তাদের তাগাদা দেব। শহরের কোথাও কোথাও হয়তো ভারী যানবাহনের কারণে লাইন ফেটে গেছে। এটি দ্রুত যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার বিশ্বাস পৌরবাসী এই বিষয়ে আমার উপর আস্থা রাখবেন।