প্রকৃতি পুজোই দুর্গাপুজো

রণজিৎ ভট্টাচার্য
শ্রীশ্রী চণ্ডীর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ১১-১২ শ শ্লোকে বর্ণিত উপাখ্যান অনুযায়ী, ‘সুরথ (রাজা) ও সমাধি (বৈশ্যপুত্র) উভয়ে নদীতীরে দুর্গাদেবীর মাটির প্রতিমা তৈরি করে ফুল-ফল, ধূপ-দীপ (বা হোম) ও নৈবেদ্যাদি উপাচার দিয়ে দেবীর পূজা করিলেন। তারা কখনও না খেয়ে কখনও বা অল্পাহারী থেকে এবং সমাহিত হয়ে তদগতচিত্তে স্বদেহ রক্ত-সিক্ত (পশুকুষ্মা-াদি) বলি দেবীর চরণে নিবেদন করিলেন।’ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুযায়ী সুরথ ও সমাধি নদীতীরে মেধসমুণির আশ্রমে পুজো সমাপ্ত করে দেবীপ্রতিমা নদীতে বিসর্জন করেছিলেন।
সে পুজো হয়েছিল চৈত্রমাসে যখন সূর্য উত্তরায়নে থাকে। বলা ভালো চৈত্রের শুক্লা সপ্তমী থেকে দশমী তিথিতে এ পুজো করেছিলেন, যাকে আমরা বাসন্তী পুজো হিসাবে জানি। কিন্তু বাংলায়, শুধু বাংলায় কেন, সারা ভারতে যে পুজো বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়, এমনকী বিদেশেও যে সব ভারতবাসী বিশেষ করে বাঙালিরা থাকেন বা বাধ্য হচ্ছেন থাকতে, সুযোগ পেলেই এ পুজোর অনুষ্ঠান করেন শত বাঁধা পেড়িয়ে, তবে সে পুজো হয় শরৎকালে, যখন সূর্য অবস্থান করে দক্ষিণায়নে। অর্থাৎ বছরের যে সময়টায় সূর্য ক্রমশ দক্ষিণ দিকে সরে সরে যায় (২১জুন-২২ডিসেম্বর), যখন দেব-দেবীররা নিদ্রিত থাকেন। রামায়ণ অনুযায়ী দেবীর অনুগ্রহ লাভে এ সময়ে পুজো করেছিলেন রামচন্দ্র। ‘ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ’ অর্থাৎ রাবণের বধ ও শ্রীরামচন্দ্রের অনুগ্রহের জন্য পুরাকালে ব্রহ্মা অকাল বোধন করেছিলেন। এই বোধন আচারটি করা হয় বেলগাছের তলায়, কারণ বেলগাছকে বলা হয় শ্রীবৃক্ষ। ষষ্টীতিথির সন্ধেবেলায় করণীয় পুজো শেষ করে বেলগাছের মূলে গিয়ে পুজো করার রীতি আছে। উদ্দেশ্য দেব-দেবীর নিদ্রার সময় দেবীকে জাগানো-‘অহমপ্যাশ্বিনে তদ্বদষষ্ঠাং সায়াহ্নে বোধয়ামি বৈ। ধর্মার্থ কাম মোক্ষায় বরদা ভব শোভনে।’ অর্থাৎ হে শোভনে ধর্মার্থ কামমোক্ষার্থে তুমি বরদা মূর্তিতে প্রকাশিত হও। ইন্দ্র তোমার পূজা করে স্বরাজ্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তেমনই আমিও জাগ্রত করছি তোমাকে। রাম যেমন দশাননকে নিহত করেছিলেন, তেমনই আমিও শত্রুগণকে বিনষ্ট করব। আমাকে শক্তি দাও।
পরদিন সকালে নবপত্রিকা স্নান করিয়ে এনে ম-প দ্বারে তাঁর পুজো হয়। সেই নবপত্রিকায় থাকে নয়টি বিভিন্ন গাছ যার মধ্যে ৫টি ওষধি অর্থাৎ একবার ফল দিয়েই যে গাছ মরে যায় আর ৪টি স্থায়ী গাছ। প্রত্যেকটি গাছই কোনও না কোনও দেব বা দেবীর প্রতীক হিসাবে একত্রিত করে নবপত্রিকা তৈরি হয়। ‘রম্ভা কচ্চী হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। অশোকা, মানকশ্বৈব ধান্যাঞ্চ নবপত্রিকা।।’ অর্থাৎ গাছগুলো হল রম্ভা বা কলা, কালকচু, হরিদ্রা বা হলুদ, জয়ন্তী, বিল্ব বা বেল, দাড়িম বা ডালিম, অশোক, মানকচু এবং ধান।
এই নবপত্রিকাকে নদী, দীঘিতে স্নান করিয়ে ম-পে নিয়ে এসে ম-প দ্বারে পুজো সেরে সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে, সাজিয়ে দেবী প্রতিমার ডানদিকে গণেশের পাশে স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তী চারদিনই দেবীর প্রতীক হিসাবে পুজো করা হয়। বলা ভাল, দেবীর অন্য একটি রূপ এই নবপত্রিকা।
নবপত্রিকার বিভিন্ন গাছের প্রতীক হল- বেলের অধিষ্ঠাত্রী মহাদেব, কলাগাছ রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচুগাছ কালিকার প্রতীক, হলুদ বা হরিদ্রাতে দুর্গা, ধান লক্ষ্মীর, জ্য়ন্তী-কার্তিক, ডালিম বা দাড়িম্বগাছ-রক্তদ-িকা, মানকচু চামু-ার আর অশোক দেবী শোকরহিতার প্রতীক। প্রত্যেক দেব বা দেবীকে আবাহন করে নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে পুজো করার রীতি। যেমন ধানগাছের ক্ষেত্রে লক্ষ্মীকে আবাহন করে ‘ওঁ ধান্যাধিষ্ঠাত্র্ৈয লক্ষ্যৈ নমঃ’ এই ক্রমে পুজো করে এই মন্ত্রে প্রণাম করার রীতি-‘ওঁ জগতঃ প্রাণরক্ষার্থং ব্রহ্মণা নির্ম্মিতং পুরা। উমাপ্রীতিকরং ধান্যং তস্মাত্ত্বং রক্ষ মাং সদা।’ এইভাবেই সব গাছকে বিভিন্ন দেব দেবীর নামে পুজো শেষে নবপত্রিকায় দুর্গার আবাহন করে ‘ওঁ হ্রীং নবপত্রিকাবাসিন্যৈদুর্গায়ৈ নমঃ।’- এই মন্ত্রে পুজো শেষে প্র্রণাম মন্ত্রটি এরকম-‘ওঁ পত্রিকে নবদুর্গে ত্ত্বং মহাদেবমনোরমে। পূজাং সমস্তাং সংগ্হ্যৃ রক্ষা মাং ত্রিদশেশ্বরি।’ তাহলে দেখা গেল প্রচলিত কাহিনির কলাবউ কখনই গণেশের বউ নয়।
এটা সকলেরই জানা যে নবপত্রিকার জন্য নির্বাচিত প্রতিটি গাছই সমগগ্র মানবজাতির পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়া পঞ্চপল্লব, আম, অশোক, বট, অশ্বত্থ, যজ্ঞডুমুর এইসব গাছের একটি করে পল্লব নিয়ে পঞ্চপল্লব তৈরি করে ঘটে স্থাপন করা হয়। সঙ্গে থাকে সশীষ ডাব। এছাড়া অর্ঘ্যরে জন্য দরকার দুর্বা, যজ্ঞের জন্য অশ্বত্থ পাতা আর আহুতি দেওয়া হয় বেলপাতা। সঙ্গে থাকে ফুলমালা,ফলমূলাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে সমগ্র প্রকৃতিকে একত্রে জড়ো করে পুজো উপকরণ সাজানো হয়। এই মহাপুজোর সময় নির্বাচন হয়েছে বছরের এমন একটা সময় যখন বর্ষা শেষ কিন্তু শীত আসতে কিছুটা বাকি। মাঠে কৃষির প্রাথমিক কাজ শেষ, ধানের শীষ দেখা দিয়েছে। এবার ধান পাকলে ধান কাটা হবে। এর মধ্যে এই অবসর সময়ে কৃষিজীবী সকলেই আশান্বিত মনে উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ ঋতুবৈচিত্রে সমৃদ্ধ প্রকৃতির সমস্ত সুযোগ নিয়ে এ পুজো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা। তাই অন্যভাবে বলতে গেলে দেবীপুজোর নামে প্রকৃতির সম্ভার দিয়ে প্রকৃতির পুজো উৎসব পালিত হয়।
এমনভাবেই প্রকৃতির সমস্ত সুযোগ সুবিধা নিয়ে নানা স্থায়ী গাছকে আমরা দেবতা প্রতীকে পুজো করছি বছরের পর বছর। কিন্তু বসতের জন্য, উন্নত জীবনযাত্রার প্রয়োজনে শত শত হাজার হাজার গাছ প্রতিনিয়ত কেটে সাফ করে চলেছি আমরাই। বন কেটে বসত, যাতায়াতের জন্য সড়ক, বাধ, ব্রীজ, সব তৈরি করার জন্যই চলছে অবিরাম গাছ কাটা। চলছে বন কেটে সাফ করার কাজ। এটা সর্বজনগ্রাহ্য তথ্য। কিন্তু আজ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নদীভাঙ্গন বাড়ছে, বৃষ্টি কমছে, পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, জীবন প্রায় দূর্বিসহ হয়ে উঠছে। কিন্তু বৃক্ষ উচ্ছেদের কোনও বিরাম নেই। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন জঙ্গল সাফ করতে গিয়ে বন্য প্রাণীর আবাস্থলে টান পড়ায় তারা জনবসতিতে চলে আসায় তাদের শরীর থেকে নানা জীবাণু মানব শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সার্স, ইবোলা, স্যোয়ান ফ্লু থেকে বর্তমানের করোনা সব রোগ সংক্রমণের পেছনে কারণ পশুবাহিত জীবাণু। শহরের আধুনিক মানসিকতার সমর্থকেরা হয়ত মনে মনে মেনে নিলেও স্বীকার করতে চাইবেন না। এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্ত এবং অন্য একটি সর্বভারতীয় দলের প্রতিবাদের মধ্যেই দ্বিমতের অস্তিত্ব প্রমাণিত।
সে যাই হোক। সেজন্য পুজো অনুষ্ঠানের কমতিতো নেই-ই। প্রতিদিন বাড়ছে সংখ্যা, বাড়ছে জৌলুস, যদিও নেই চেতনার উন্মেষ। পুজো অনুষ্ঠানের বিশেষ উদ্দেশ্য ব্যক্তিজীবনে এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক উন্নতির নিরিখে কতটা এগুনো গেল সে মূল্যায়ন সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রায় সবাই এবছরের দুর্গাপুজোয় সামিল হচ্ছি। করোনা পরিস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে অনেকেই পুজোর বাজার করেছি। সপরিবারে ঠাকুর দেখতেও বেরোচ্ছি। দেবীদুর্গার কাছে একটাই প্রার্থনা, মা কৈলাসে ফিরে যাবার সময় করোনাকে সঙ্গে নিও। জয় মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।
সূত্র : যুগশঙ্খ