প্রখর রোদে খোলা আকাশের নীচে পরীক্ষা দিল শিশু শিক্ষার্থীরা

বিশেষ প্রতিনিধি
জমি-জমার মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকায় স্কুলঘর থেকে অমানবিকভাবে বের করা দেওয়া হলো শিশু শিক্ষার্থীদের। সোমবার ঐ বিদ্যালয়ের ১৬২ জন শিক্ষার্থী প্রখর রোদে খোলা আকাশের নীচে বসে পরীক্ষা দিয়েছে । প্রখর রোদে খোলা আকাশের নীচে পরীক্ষা দেয়ার সময় অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। দোয়ারাবাজার উপজেলার মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণ করা হয়। এই বিদ্যালয়ের জমির মালিকানা নিয়ে দোয়ারাবাজার ডিগ্রী কলেজের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে।
জানা যায়, ১৯৯৪ সালে মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ৩৩ শতক জমি দানপত্র রেজিস্ট্রি করে দেন একই গ্রামের ঠাকুর চান দাসের ছেলে সারদা কান্তি দাস। প্রায় ৩ বছর পাঠদানের পর বিদ্যালয়টি ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়। ঘর না থাকায় পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ থাকে। এসময় ঐ বিদ্যালয়ের জমি খালি থাকায় ঐ জমিতেই দোয়ারাবাজার ডিগ্রী কলেজের ৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। কলেজ ৪ তলা ভবনে স্থানান্তরিত হলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে দোয়ারাবাজার কলেজের আগের টিনশেড ঘরটি। ২০০৭ সালে দোয়ারাবাজার কলেজের পরিত্যক্ত এই টিনশেড ঘরে মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম আবারও শুরু হয়। সম্প্রতি, মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন সারদা কান্তি দাস বিদ্যালয়ের যে জমি দানপত্র করে দিয়েছিলেন, সেটি পরবর্তী সময়ে কলেজকে দানপত্র করে দিয়েছেন। বিষয়টি জেনে স্কুল কর্তৃপক্ষ দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যান । দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানান, মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে। ওখানে ১১৫ শতক জমি রয়েছে। এই সংবাদ জেনে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমি বন্দোবস্তের আবেদন করেন। বিষয়টি জেনে দোয়ারাবাজার কলেজের অধ্যক্ষ ক্ষিপ্ত হন। তিনি ঐ দিনই মংলারগাও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড খুলে ঐ ঘরে তালা ঝুলিয়ে রাখেন। সোমবার বিদ্যালয়ের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের ১৬২ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত হলে কলেজ অধ্যক্ষ একরামুল হক শিক্ষার্থীদের ঘরে ঢুকতে দেননি। পরে প্রখর রোদে খোলা আকাশের নীচে পরীক্ষা দিয়েছে এই শিশু শিক্ষার্থীরা। এসময় বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সোনিয়া, প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী চিত্ত দাস ও জগাই দাস অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুবী রানী দাস বলেন,‘৯৪ সালে সারদা কান্তি দাসের দান করা ৩৩ শতাংশ জমিতে স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কয়েকবছর পর স্কুলঘর ঝড়ে বিধ্বস্ত হওয়ায় পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সাল থেকে আবার কলেজের পরিত্যক্ত ঘরে নিয়মিত পাঠদান শুরু হয়। ২০১০ ও ২০১৩ সালে বেসরকারী স্কুলগুলো সরকারীকরণের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে না পারায় এই স্কুলটি জাতীয়করণ হয়নি। যে ঘরে আমরা স্কুল কার্যক্রম পরিচালনা করছি, সেই ঘর নিজেরা ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ঠিকটাক করিয়েছি। এখন স্কুলটি সরকারীকরণের জন্য দানপত্র দলিলের নকল বের করেছি। দলিল বের করার পর দেখলাম, যে জমি স্কুলের সেখানে কলেজের ভবন হয়েছে। আমরা তখন দুশ্চিন্তায় পড়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যাই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের চার শিক্ষককে জানান, যেখানে বিদ্যালয় পরিচালনা হচ্ছে সেটি অর্পিত সম্পতি। এটি কলেজের নামে একবছরি বন্দোবস্ত রয়েছে। তিনি আমাদের বর্তমান স্কুলঘরের অর্পিতসম্পত্তিভূক্ত জমি বন্দোবস্থ নেয়ার আবেদন করার পরামর্শ দেন। আমরা যথারীতি বন্দোবস্থের আবেদন করি। ঐ আবেদনের পরই কলেজ অধ্যক্ষ ক্ষুব্ধ হন এবং সাইনবোর্ড খুলে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেন।’
মংলারগাঁওয়ের সাবেক ইউপি সদস্য এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিভাবক তাজুল ইসলাম বলেন,‘মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে এখন দোয়ারাবাজার ডিগ্রী কলেজ, আমরা তাতে অখুশী নই। কিন্তু পরিত্যক্ত অর্পিত জমিতেও স্কুল পরিচালনায় কলেজ অধ্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। সোমবার পরীক্ষা দিতে আসা শিশুদের তিনি স্কুলে ঢুকতে দেননি। অমানবিক আচরণ করেছেন। শিক্ষার্থীরা মাঠে বসে পরীক্ষা দিতে চাইলে কলেজের শিক্ষার্থীদের ফুটবল দিয়ে মাঠে খেলতে ছেড়ে দেন তিনি। এক পর্যায়ে স্কুলের পেছনে ১৬২ জন শিশু শিক্ষার্থীকে নিয়ে আসা হলে ওখানেও তিনি তাদের অবস্থানে বাধা দেন। শেষে মংলারগাঁও-কলেজমুখী সড়কে প্রখর রোদে বসে পরীক্ষা দিতে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমরা এমন অমানবিক ঘটনার বিচার চাই।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মআহ্বায়ক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক বলেন,‘পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ খুবই দুঃখজনক। বাচ্চারা মাঠে বসেও পরীক্ষা দিতে পারেনি।’
মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি ও বিদ্যালয়ের ভূমিদাতা সারদা কান্তি দাস বলেন,‘দোয়ারাবাজার ডিগ্রী কলেজে এবং মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি জমি দান করেছি। মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় শুরু হবার কয়েক বছর পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কলেজ অধ্যক্ষ ঐ জমি কলেজের নামে লিখে দেবার অনুরোধ করায় আমি আবরও কলেজের নামে দানপত্র দলিল করে দেই। এখন সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করলেই ভাল হয়।’
দোয়রাবাজার ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ একরামুল হক বলেন, মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কলেজের জমিতে কোন স্কুলঘর কখনোই ছিল না, এখনও নেই। ঐ বিদ্যালয়ের বাচ্চারা কোথায় পরীক্ষা দিয়েছে তাও তাঁর জানা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন,‘মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হয়ে আসছিল দোয়ারাবাজার কলেজের একটি টিনশেড ঘরে। যেখানে ঐ ঘরটি রয়েছে সেটি অর্পিত সম্পত্তি। অর্পিত জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল কলেজকে। তারা বছর বছর লিজের টাকা পরিশোধ করেন। গত বুধবার তারা লিজের টাকা পরিশোধের আবেদন করেন। বৃহস্পতিবার মংলারগাঁও বেসরকারী স্কুল কর্তৃপক্ষ জমি বন্দোবস্তের আবেদন করেন। বন্দোবস্থের আবেদন প্রক্রিয়া করতে কিছু সময় লাগবে। এদিকে মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কলেজের যে ঘরটি ব্যবহার করতো সেটি ব্যবহার করতে বাধা দিচ্ছেন কলেজ কর্র্তপক্ষ, তারা ঐ ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এই অবস্থায় পাশের নৈনগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে মংলারগাঁও বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেবার জন্য বলা হয়েছে। ’