প্রতিবন্ধীতা কোন প্রতিবন্ধকতা নয়

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রতিবন্ধীতা কোন প্রতিবন্ধকতা নয়। ইচ্ছে থাকলেই এই বাধা অতিক্রম করে এগুনো যায়। এটি প্রমাণ করেছেন সুনামগঞ্জের বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার দরিদ্র পরিবারের প্রতিবন্ধী তরুণ সুজিত শর্মা। দুই পা হীন শারীরিক প্রতিবন্ধী সুজিত সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স এর শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তিনি মাস্টাররোলে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চাকুরিও করছেন। সুজিত পরিবার, সমাজ কিংবা দেশের বোঝা নয়, বরঞ্চ বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবার জন্য তিনি অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই নিজেকে তৈরি করছেন।
সুজিত শর্মা’র বয়স ২২ বছর। বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার দরিদ্র ব্রাহ্মণ মনোরঞ্জন শর্মার চার সন্তানের মধ্যে সে সবার ছোট। মা জয়ন্তি শর্মাও শারীরিক প্রতিবন্ধী। সুজিতের বড় দুই বোনকে সমাজের বিত্তবানদের সহায়তায় বিয়ে দিয়েছেন মনোরঞ্জন শর্মা। আর্থিক অনটেনের কারণে বড় ভাই চাকুরি করছে একটি ওষুধের দোকানে। শারীরিক প্রতিবন্ধী সুজিত বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার পলাশ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে, এই উপজেলার দিগেন্দ্র বর্মণ ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যবসা শিক্ষায় এইচএসসি পাস করেন। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স পড়ছেন এই শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সহায়তায় দুই দফা প্রশিক্ষণ দিয়ে কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রামেও সে দক্ষ। তার এই দক্ষতার কথা জেনে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন মাস্টাররোলে পার্টটাইমে তাকে চাকুরিও দিয়েছেন। সুজিতের অফিসের সহকর্মী ও সুনামগঞ্জ প্রতিবন্ধী সহায়তা কেন্দ্রের স্টাফরা বললেন, কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রামে সুজিত এখন অন্যদের চেয়ে ভাল। সে ক্রমশ সমাজের আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠছে।
প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, সুনামগঞ্জের থেরাপি সহকারী আরিফুল ইসলাম জানালেন, প্রতিবন্ধী হলেই ঘরে বসে থাকতে হবে না। এটা বুঝিয়েছেন সুজিত শর্মা। উদ্ভাবনী শক্তি এবং চিন্তায় অনেক সময় সুস্থ্য মানুষের চেয়েও প্রতিবন্ধীরা অগ্রসর থাকে তা সুজিত বুঝিয়েছেন।
সুজিত বললো, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে আমি সমস্যা মনে করছি না। আমি কাজ চাই, কম্পিউটারের অনেক প্রোগ্রামের কাজ দ্রুত করতে পারি। পড়াশুনার পাশাপাশি চাকুরি করে বাবারে সহায়তা করতে চাই। আমার পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা দিচ্ছেন। অন্য অনেকেই আমাকে সহযোগিতা করছেন। আমি দরিদ্র বাবা-মা’র মুখে হাঁসি দেখতে চাই।
প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র সুনামগঞ্জের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তানজিলুর রহমান জানালেন, সুনামগঞ্জে অটিজম, শারিরিক প্রতিবন্ধীতাসহ নানাভাবে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২১ হাজার ৩৪০ জন। এরমধ্যে উদ্যোগী কিছু প্রতিবন্ধীর একজন সুজিত শর্মা। আমরা তার জীবনকে গতিশীল করার জন্য কিছু চিকিৎসা দিয়েছি। হুইল চেয়ার প্রদান করেছি। সে নিজের কাজ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে প্রতিবন্ধীতা জীবন চলার পথে প্রতিবন্ধকতা নয়।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ জানালেন, প্রতিবন্ধী সুজিত তার নিজের যোগ্যতায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মাস্টাররোলে চাকুরি পেয়েছে। তিন তলায় ওঠতে তার সমস্যা হয়। নিচের তলার জেলা ডিজিটাল সেন্টারে তাকে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে।