প্রতিবাদ সংগত হামলা অসংগত

ডাকসু নির্বাচনে কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে গত সোমবার রাতে জেলা সদরে ছাত্র ইউনিয়নের একটি প্রতিবাদী মিছিল যখন আলফাত স্কয়ারের অনতিদূরের রমিজ বিপণি অতিক্রম করছিল তখন সেই মিছিলে হামলা চালায় কতিপয় যুবক। হামলায় আহত হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী। এই শহরে আশির দশকে ছাত্র সংগঠনগুলোর পালটাপালটি হামলা ও আক্রমণের কিছু ঘটনাক্রম থাকলেও তখন সেগুলো কেবল সংগঠনের ছাত্রকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বহিরাগতরা কম ক্ষেত্রেই ছাত্র সংগঠনের বিষয়ে মাথা ঘামাত। বলাবাহুল্য তখন অনেকগুলো ছাত্র সংগঠনই শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে ছাত্র রাজনীতির মাঠ চষে বেড়াত। সময়ের পরিবর্তনের সাথে ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম শিক্ষাঙ্গন থেকে বিদায় নিয়ে একসময়ে টেন্ডারবাজি আর তদবিরবাজির অন্ধগলিতে আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর তল্পিবাহকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায় ছাত্র নেতাদের। ঐতিহ্যবাহী ছাত্র রাজনীতি সংকোচনের ফলে সমাজ থেকে প্রতিবাদী মানসিকতাও কমে আসতে শুরু করে। সর্বত্র আশ্চর্য ধরনের সহনশীলতা ও নির্লিপ্ততা দেখা দেয়। এই অবস্থায় যখন ক্ষুদ্র পরিসরে কোন সংগঠন ছাত্র রাজনীতির নিভু নিভু সলতে জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করে তখন তারাও বাধাগ্রস্ত হয় নানাভাবে। মঙ্গলবারের হামলা এই ধরনের একটি বিশেষ অশুভ লক্ষণ। এ থেকে বিরুদ্ধ মতের বিষয়ে সহনশীলকতার অভাবটি প্রকটিত হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের অনিয়মের প্রতিবাদে কোন ছাত্র সংগঠন যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করে তখন সেটি কোনভাবেই দোষণীয় কীছু হতে পারে না। রাজনৈতিক শিষ্টচারের অংশ হিসাবে একে গ্রহণ করা এবং অবশ্যই পালটা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে জবাব দেয়াটা হল শোভনীয় রীতি। এর পরিবর্তে যখন অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা হয় তখন সকলের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে যায়Ñ প্রতিবাদ নয়, বিরুদ্ধ মত নয়, আমরা এসব সহ্য করি না। কোন গণতান্ত্রিক সমাজে এমন মনোভাব ভীষণভাবে বিপদজনক। এর মধ্য দিয়ে মূলত রাজনীতি থেকে মেধার নির্বাসন ঘটে, বিদায় নেয় সুদৃঢ় ব্যক্তিত্ববোধ এবং অবশ্যই রাজনৈতিক চর্চা। এই ধরনের অবস্থা আমরা কামনা করি না। তাই ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে হামলার বিষয়টি কখনও বিন্দুমাত্র সমর্থনযোগ্য নয়।
দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। এই পথ ধরে সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হল। ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিন দশকের ব্যবধানে যখন ছাত্র রাজনীতিতে সাংগঠনিক চর্চার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হল তখন অবশ্যই সর্বত্র ছাত্র সংগঠনগুলোকে অবাধে তাদের কর্মসূচী পালন করার পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে। ছাত্ররা যখন সুস্থ রাজনীতিতে মনোনিবেশ করে তখন সেখান থেকে খারাপ কিছু উৎপাদিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। বরং এই চর্চার মধ্য দিয়ে দেশে সুনেতৃত্ব বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমাদের এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানাতে হবে।
ছাত্ররা সমাজের প্রাগ্রসর অংশ। বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক বহু অর্জন ছাত্রদের হাত ধরেই অর্জিত হয়েছে। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির গৌরবজনক ভূমিকা এই জাতির চিরকালীন গৌরবের অংশ। ছাত্রদের তাই সুস্থভাবে রাজনীতি করার অধিকার দিতে হবে। এতে ছাত্রদের বিপথগামিতার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। সুস্থ চর্চা সবসময়ই অসুস্থ চর্চাকে বিদায় করে দেয়। এই কথাটি আমরা যত বেশি মনে রাখব তত আমরা উন্নত বাংলাদেশের পথে কদম কদম এগোতে থাকব।