প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রতারণা

বিশেষ প্রতিনিধি
কাজ অর্ধেক বাকী রেখেই, প্রায় দুই কোটি টাকার স্থাপনা প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে উদ্বোধন করানো হয়েছে। গত বছরের (২০১৮ ইংরেজি সনে) নভেম্বর মাসে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে উল্লেখ করে শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন উদ্বোধন করা হয়। অথচ. এখনো এই ভবনের কাজই শেষ হয় নি। শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ৬৫ ভাগ কাজ হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শাল্লা উপজেলা সদরের গোবিন্দ চন্দ্র সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ শুরু হয়। সিলেটের আক্তার ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান প্রথম বছর কাজ করলেও দ্বিতীয় বছর থেকেই কাজে গাফিলতি শুরু করে। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০১৮ সালে কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও কাজ অসমাপ্ত রেখেই এক বছর আগে ঠিকাদারের লোকজন সবকিছু গুটিয়ে চলে আসে।
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আক্তার ট্রেডার্স কাজ না করেই এই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ শেষ দেখিয়ে সিংহভাগ বিল ইতিমধ্যে উত্তোলন করেছে।
শাল্লা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু বলেন, এই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন আদৌ হবে কি-না, এই নিয়ে শঙ্কিত শাল্লার মানুষ। তিন তলা পর্যন্ত শেওলা পড়ে পুরাকীর্তির আকার ধারণ করেছিল। দেওয়ালের কোথাও কোথাও গাছ গজিয়েছিল। এখন আবার কাজ ধরেছে, তবে কাজ চলছে ঢিমেতালে।
শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বলেন, শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নিয়ে কেবল প্রধানমন্ত্রী’র সঙ্গে প্রতারণা করা হয় নি, কাজ শেষের আগে ঠিকাদারকে বিলও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শুরু হওয়া অন্য ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ একই পরিমাণ বরাদ্দে শেষ হয়ে গেছে। শুনেছি, এই স্টেশনের কাজ শেষ করার জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর হোসেন বলেন, শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের জন্য বরাদ্দ কত টাকা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়কে কখনো জানানো হয় নি। নির্মাণাধীন ভবনের পাশেও বরাদ্দের বা প্রকল্পের কোনো সাইনবোর্ড নেই। আমি শাল্লায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেছি ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর। এর এক- দুই দিন আগে দেশের অন্য এলাকার কিছু প্রকল্পের সঙ্গে শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ভবনও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করানো হয়।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বলেন, আমি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার পর গত জুন মাসে জেলা উন্নয়ন-সমন্বয় কমিটির সভায় এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছি। এরপরও কিছু না হওয়ায় জুলাই মাসের সমন্বয় সভায় আমি বলেছিলাম, এই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও প্রতারণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানাবো আমি। জেলা প্রশাসক মহোদয়ও ওই সভায় গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর উপর ক্ষুব্ধ হন। তিনি এই ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেন। এরপর কাজ শুরু হয়েছে। তবে যেভাবে কাজ চলছে, পানি থাকতে থাকতে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা আছে। পরে আবার বলবে, পানি শুকিয়ে গেছে, মালামাল আনতে সমস্যা, কাজ করা যাচ্ছে না।
শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল অদুদ বললেন, শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ নীচু এলাকায় করায় এই স্টেশনের সীমানা দেওয়াল নরমালভাবে করা যাচ্ছে না। রডের কাজ করতে হবে। যোগাযোগের সড়কও আরসিসি করতে হবে। এজন্য এই স্টেশনের কাজ শেষ করতে আরও ৩৮ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে। কাজ চলমান রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
গত নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধনের বিষয়ে এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ভাল বলতে পারবেন বলে জানান উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল অদুদ।
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবিল আয়ান বলেন, শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কাজ চলমান রয়েছে। কাজ শুরু’র সময় এর ব্যয় নির্ধারণ হয়েছিল প্রায় দুই কোটি টাকা। এখন দেখা যাচ্ছে ওই বরাদ্দে কাজ শেষ হবে না। এজন্য আরও আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হবে। ঠিকাদারকে পুরো বিল দেওয়া হয় নি। নির্মাণ শেষ হয়েছে, এটি আমরা কখনই বলি নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এটি উদ্বোধন করলেন, সেটিও আমার জানা নেই।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, শাল্লা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নিয়ে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। নির্মাণাধীন এই স্টেশনটির কাজ সন্তোষজনক পর্যায়ে পেঁৗঁছায় নি।