প্রবাসীদের দ্বারা প্যারা শিক্ষক নিয়োগ, এই আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে

জগন্নাথপুরে প্রবাসীদের সংগঠন মীরপুর ইউনিয়ন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিটিতে একজন করে ১৩ জন প্যারা শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সম্মানী ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হবে এবং যতদিন পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট থাকবে ততদিন তারা প্যারা শিক্ষক রাখবেন বলে জানিয়েছেন। বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছি। শিক্ষার প্রসারে প্রবাসী সংগঠনের এই ভূমিকাটি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নাগরিক সমাজের কেমন দায়িত্ব থাকা উচিত সেটি মূর্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের মত দেশগুলোতে প্রত্যেকটি সেক্টরে প্রয়োজনমাফিক সবকিছুর জোগান দেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের এই ঘাটতি পূরণ করার দায়িত্ব নাগরিক সম্প্রদায়ের। প্রাথমিক শিক্ষার মত একটি মৌলিক জায়গায় সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করে মীরপুর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট যে অসাধারণ দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন সেটি অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুষ্ঠুভাবে পাঠদান কার্যক্রম চালানোর জন্য ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৩০:১ হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিন্তু এখন প্রাথমিক শিক্ষা সেক্টরে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৬৭:১। অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ মতামত অনুসারে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যে পরিমাণ শিক্ষক থাকা উচিত বাস্তবে এর চাইতে অর্ধেকেরও কম শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই বিদ্যালয়গুলোকে উপযুক্ত মানের করে গড়ে তুলতে হবে। একদিকে যেমন শিক্ষক বাড়াতে হবে তেমনি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও শিশুদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। পাঠক্রমের পাশাপাশি সহঃ শিক্ষা কার্যক্রমকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এই বিষয়গুলোর নিশ্চয়তা বিধান করতে পারলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মানসম্পন্ন শিক্ষার্থীই বেরোবে যারা পরবর্তীতে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা স্নানত, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরিতে বিশেষ সুবিধা এনে দিবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষা জীবনের বুনিয়াদ বা কাঠামো বিবেচনা করা হয়। কাঠামো শক্ত না হলে যখন এর উপর ভবন তৈরি করা হয় তখন সেটি দুর্বল হতে বাধ্য। তবে এই বাস্তব চাহিদার বিপরীতে আমাদের সরকারের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান সরকার ২৫,২৪০ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একযোগে জাতীয়করণ করেছে। ১ লক্ষ ৩০ হাজার ১০০ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দান করেছে এই সরকার। সবকিছু মিলিয়ে দেশে এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬০১টি। শিক্ষক সংখ্যা ৩ লক্ষ ২২ হাজার ৭৬৬ জন। এত বিশাল কাজ করার পরও প্রত্যাশিত ছাত্র শিক্ষক অনুপাত বজায়ের পথে এখনও অর্ধেকের উপর কাজ বাকি। সুতরাং এই চাহিদা পূরণের বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই কতটা কঠিন বলে বুঝানোর দরকার নেই। সরকারের এই সীমাবদ্ধতার জায়গায় দেশের সচেতন ও সক্ষম নাগরিক সমাজ যদি সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করে এগিয়ে আসেন তাহলে সেটি সোনায় সোহাগা হবে। মীরপুর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ঠিক এ কাজটিই করে সকলকে দেখিয়ে দিল তোমাদেরও এমন দায়িত্ব পালন করা উচিত।
মনে রাখতে হবে এই উপমহাদেশে শিক্ষা বিস্তারের কাজটি কোন সরকারি আনুকূল্যে শুরু হয়নি। সমাজ হিতৈষী সচেতন ব্যক্তিদের হাত ধরেই শিক্ষার সোপান তৈরি হয়েছে স্থানে স্থানে। একটা সময়ে সরকার এগুলোকে জাতীয়করণ করেছে। তবে দুঃখের কথা এই, এখন ব্যবসায় বুদ্ধি তাড়িত হয়ে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার হিড়িক দেখা যাচ্ছে সেখানে কিন্তু নিছক সমাজের উপকারার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রবণতা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সমাজের এই নিস্পৃহতা ও তথাকথিত শিক্ষা ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যবৃত্তির বিপরীতে মীরপুর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাঝেই তাই আমরা আলো খুঁজি। এই আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে।