প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন নিয়ে বিতর্ক- সরকারকেই নিরসন করতে হবে

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক চলছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়, কয়েক বছর ধরেই তা চলছে। সরকার বলছে, প্রবৃদ্ধি হবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। আর বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী বা দাতাগোষ্ঠীরা সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছে। তাহলে কার বক্তব্য সত্য। সরকার এবার আশা করছে, চলতি অর্থবছর (২০১৭-১৮) প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এখনো বিদ্যমান; উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান খুব বেশি বাড়েনি। তাছাড়া সামনের দিনে আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা, সঠিক মুদ্রানীতির অভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি, মুদ্রা বিনিময় হারের কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হবে। সংস্থাটি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকটি দেশে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তারা বিনিয়োগ অথবা রফতানি কিংবা দুটো বাড়িয়ে তা অর্জন করেছে। আর বাংলাদেশ শুধু ভোগ ব্যয়ের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে নিয়ে গেছে। প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে সংখ্যা নয়, বরং যে বার্তা দেয়া হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়, বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে এটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আশা করি, সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।
প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে অর্থনীতির হালচাল বোঝা যায় না। আর ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে দাবি সরকারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, তা মেনে নিলে অত গতিশীল মনে হয় না দেশের অর্থনীতির অন্য সূচকগুলোকে। আমাদের অর্থনীতির দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো সংক্রমিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকেও। অথচ ব্যাংক খাতই হচ্ছে আর্থিক খাতের হৃদপিন্ড। ব্যাংক থেকে কত টাকা লোপাট হয়ে গেল এবং এ টাকা জিডিপির কত শতাংশ, সেই পরিমাণটা বড় বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে পুরো আর্থিক খাতই প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরেকটি দুর্বলতা হচ্ছে, মূল্যায়নহীন বড় অবকাঠামো নির্মাণ। অধিকাংশ বড় প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। কেন বেড়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা কিন্তু মেলেনি। এ কারণে সংশয় আরো বেড়ে ওঠে। আমরা চাইব, জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে চলমান বিতর্ক অবসানে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ও যথাযথ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জনগণকে আশ্বস্ত করা হবে।
নিকট অতীতে দেখা গেছে, প্রতি বছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য ও অর্জিত হার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সরকার যে প্রবৃদ্ধির হার প্রদর্শন করে, তার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের দেয়া তথ্যের তেমন মিল থাকে না। কিন্তু সরকার থেকে পরবর্তীকালে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয় না। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো, কোনো ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে সেই পরিকল্পনা কোনো দিনই সঠিক ফল দিতে পারে না। তাই যে কোনো তথ্য, তা যতই বিব্রতকর বা অপ্রীতিকর হোক না কেন, এটি মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সঠিক তথ্য যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একান্ত প্রয়োজন। বিশ্বে খুব কম দেশই আছে, যারা বছরের পর বছর একইভাবে উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কতটা অর্জিত হলো, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অর্জিত অর্থনৈতিক সাফল্যের সুফল জনগণ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে কিনা। দেশের অর্থসম্পদ কিছু মানুষ বা মহলবিশেষের হাতে পুঞ্জীভূত হলে তাকে সঠিক ও কল্যাণকর উন্নয়ন বলা যায় না। তাই অর্থনীতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি তার সুফল যাতে সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কেবল সুষম উন্নয়ন সম্ভব।