প্রসঙ্গ বাল্যবিয়ে, শিক্ষার সাথে দরিদ্রতা ও নিরাপত্তার সম্পর্কটিও অবিচ্ছেদ্য

মেয়েদেরকে বাল্যবিয়ে না দিয়ে শিক্ষিত করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক যুগ্মসচিব মো. কুতুব উদ্দিন। তিনি বাল্যবিয়ের বিবিধ কুফল বর্ণনা করে বলেছেন, মেয়েদেরকে শিক্ষিত করতে পারলে তাদের সুপাত্রস্থ করা সম্ভব, এজন্য যৌতুক দেয়ারও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। যুগ্মসচিব যথার্থ কথা বলেছেন। আমাদের গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেশি। সরকারের নানা প্রতিকারমূলক উদ্যোগের মধ্যেও বাল্যবিয়ে থেমে নেই। লুকিয়ে চাপিয়ে বা নানা কৌশল অবলম্বন করে অভিভাবকরা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এই ধরনের বাল্যবিয়ের প্রবণতা সাধারণত শিক্ষিত কিংবা স্বচ্ছল পরিবারে দেখা যায় না। বরং আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও অশিক্ষিত পরিবারগুলোর ভিতরই বাল্যবিয়ের প্রকোপ বেশি। বাল্যবিয়ে পীড়িত পরিবারগুলোর অবস্থা বিবেচনা করলে যে জিনিসটি সামনে আসে তাহলো, বাল্যবিয়ের জন্য প্রধানত ২টি কারণ দায়ী। একটি হলো অশিক্ষা, অন্যটি দরিদ্রতা। অশিক্ষা ও দরিদ্রতা মিলে মানুষের সচেতনতার স্তরকে অনেক নিচুতে নামিয়ে আনে। অন্যদিকে এই ধরনের পরিবারগুলো কিছু সামাজিক সমস্যার মধ্যেও বসবাস করে। যেমন ঘরে উপযুক্ত মেয়ে থাকলে তার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এরকম অবস্থায় অভিভাবকরা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে উদ্বেগমুক্ত হতে চায়। সমাজে অশিক্ষা, দরিদ্রতা ও নিরাপত্তাহীনতা বজায় রেখে শুধু আইন দিয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা যাবে বলে আমাদের কাছে মনে হয় না। যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হলো, এর একটির উপর আলোকপাত করেছেন যুগ্মসচিব মো: কুতুব উদ্দিন। একইসাথে যদি অপর দুইটি কারণকেও গুরুত্ব দেয়া হয় তাহলে এমন দিন বেশি দূরে নয় যেদিন কোনো পরিবারে বাল্যবিয়ের চিন্তা পর্যন্ত করা হবে না।
সমাজে মেয়েদের অগ্রগতি দৃশ্যমান। বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা বেশ দৃঢ় ও অগ্রগণ্য অবস্থানে চলে গেছে। অনেকক্ষেত্রে তারা ছেলেদের পিছনে ঠেলে দিয়েছে। যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ছেলেদের চাইতে মেয়েরাই ভাল করছে। শুধু শিক্ষায় নয়, কর্মক্ষেত্রেও মেয়েরা এগিয়ে গেছে। যেকোনো মেধাভিত্তিক কাজে মেয়েরা এখন ছেলেদের পিছনে ঠেলে দিচ্ছে। এই যে ছেলেদের চাইতে মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে সেটি অতিশয় খুশির খবর। কিন্তু একই সাথে চিন্তার বিষয় হলোÑ ছেলেরা মেধাগত জায়গায় পিছিয়ে পড়ছে। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই যদি সমান তালে এগোতে পারত তাহলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ দেখতে পেতাম আমরা। রাষ্ট্রচিন্তকদের ছেলেদের এই পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি আমলে নেয়ার সময় এসেছে। কেন ছেলেরা লেখাপড়ার প্রতি বিমুখ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখে এ থেকে পরিত্রাণের পথ বাতলে দিতে হবে। ছেলেদের অবনতির জন্য একটা কারণ তো চোখের সামনেই আছে। সেটি হলোÑ এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার। এই দুই দুষ্ট প্রপঞ্চ ছেলেদের মেধাকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যে অফুরন্ত সম্ভাবনার আশায় আমরা এন্ড্রয়েড মোবাইল ও ইন্টারনেটকে স্বাগত জানিয়েছিলাম সেটি এখন বুমেরাং হয়ে আমাদের উপরই আঘাত হানা শুরু করেছে। এই বিপদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা সামনে এমন দিন আসবে, যখন মেয়েদের নয়, ছেলেদের এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রের বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণের প্রয়োজন হবে।
বাল্যবিয়ের সাথে শিক্ষার যে সম্পর্কসূত্র নিয়ে এই স্তম্ভের অবতারণা সেটির উপসংহার টানা দরকার। যেসব পরিবার এখনও শিক্ষার অবারিত সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে না অবশ্যই তাদের শিক্ষাঙ্গনে নিয়ে আসতে হবে। একই সাথে সমাজে বিরাজমান প্রকট ধনবৈষম্য কমিয়ে একেবারে দরিদ্র পর্যায়ের লোকগুলোকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। সমাজে অনিরাপদ যে পরিবেশ সেটিও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।