প্রস্তুতির জন্য সময়ক্ষেপণ অনভিপ্রেত- শনাক্তদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলিশন জরুরি

শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বুলেটিনে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪০৩১ পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তকৃত আক্রান্তের সংখ্যা ৩২৪০ জন বলে জানানো হয়েছে। আক্রান্তের শতকরা হার ২৩.০৯%। গত দুই বা তিন সপ্তাহ যাবৎ আক্রান্তের হার ২০ শতাংশের উপরে থাকছে। এখন এই হার ২৫ এর দিকে ধাবমান। অর্থাৎ প্রতি ৪টি পরীক্ষায় এখন ১ জন করোনাক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে। শনাক্তের এই হার কতোটা ভয়াবহ তা অনুধাবন করতে বড় কোনো জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। পরীক্ষার পরিমাণ বাড়লে আক্রান্তের সংখ্যাটি অনেক বেশি হয়ে যাবে। বয়স্ক করোনাক্রান্তরা মানসিক চাপ ও শারীরিক অন্যান্য জটিলতা সামলাতে না পেরে মৃত্যুবরণ করছেন। এখন প্রতিদিন সরকারি হিসাব মোতাবেক গড়ে ৪০ জন করোনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। শনিবার পর্যন্ত মোট মৃত্যু ১৪২৫ জন। এই সংখ্যাটিও উপেক্ষণীয় নয়। বহু বরেণ্য ব্যক্তি মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযুক্ত হলেন দেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। করোনায় বিশিষ্ট জনদের দলে দলে চলে যাওয়া দেশের মেধাগত অবস্থানকে দুর্বল করছে। মৃত্যুবরণ করছেন বহু চিকিৎসক। একজন চিকিৎসক তৈরি করতে বহু সময় লাগে। তাঁদের উপর মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব অর্পিত থাকে। আজ দেখা যাচ্ছে অন্যকে বাঁচানোর দায়িত্ব নেয়া চিকিৎসকদের জীবনেরও কোনো নিরাপত্তা নেই। মারা যাচ্ছেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বহু চৌকষ সদস্য। এই প্রতিটি মৃত্যু জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। এমন বহু ক্ষতি করে চলেছে অপ্রতিরোধ্য ঘাতক করোনা। এদিকে শান্ত ও নিরীহ জনপদ সুনামগঞ্জ জেলাটিও ভীষণরকমের অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসনের ফেসবুক পেজে প্রচারিত শনিবারের তথ্য অনুসারে সর্বমোট ৬৮৪৬ পরীক্ষার বিপরীতে আক্রান্ত শনাক্তের সংখ্যা ৭৮৫ জন। গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য অনুসারে শনাক্তকৃত আক্রান্তের পরিমাণ ৭৯০ জন। জেলায় আক্রান্তের শতকরা হার ১১.৪৬%। সারা দেশের মতো গত ২৪ ঘণ্টার হিসাব মোতাবেক আক্রান্তের হার ক্রমবর্ধমান। ছাতক ও সদরের অবস্থা সবচাইতে করুণ। সুতরাং করোনাকে হালকা করে দেখার উপায় কই?
সাধারণ ছুটি প্রত্যাহারের পর আক্রান্ত হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় সরকার জোনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কথা বলতে শুরু করেছিলো। এ লক্ষে আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনা করে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে ম্যাপিং এর কাজ শেষ করে সারা দেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ জোনে ভাগ করে তালিকা প্রকাশ করা হয়। সুনামগঞ্জেও আমরা দেখেছি সিভিল সার্জন জেলার ১৫টি এলাকাকে রেডজোন ঘোষণা করে গত সপ্তাহের মঙ্গলবার বিজ্ঞপ্তি জারি করেন এবং রেডজোনভুক্ত এলাকার জনসাধারণের করণীয় নির্ধারণ করে দেন। ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর রেডজোন এলাকায় লকডাউন কার্যকর হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সারা দেশে যেমন রাজধানীর এক পূর্ব রাজারবাজার ছাড়া আর কোথাও লকডাউন কার্যকর হয়নি তেমনি সুনামগঞ্জেও নেই কোনো লকডাউন। রেডজোনের লকডাউন কার্যকরের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের কথা এখন বলা হচ্ছে যার কোনো যৌক্তিকতা আমরা খোঁজে পাচ্ছি না। অনুমোদনের সাথে প্রস্তুতি গ্রহণের আরেকটি অজুহাত যুক্ত হতে দেখছি আমরা রাজধানীতে। সুনামগঞ্জে অবশ্য রেডজোনে সিভিল সার্জনের বিজ্ঞপিত আচরণবিধি কেন কার্যকর হচ্ছে না তার কোনো সরকারি ভাষ্য পাওয়া যায়নি। আদৌ রেডজোনে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হবে কিনা তাও এখন অনিশ্চিত। সার্বিক অবস্থায় মনে হয় সরকার দেশের কোথাও কোনো লকডাউন দিতে চাচ্ছে না। কিন্তু এই কথাটি আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়ে নানা কারণকে সামনে আনা হলে জনমনে প্রচুর বিভ্রান্তি তৈরি হয়। দুর্যোগকালে এমন অস্পষ্ট অবোধ্য কৌশল কখনও কাম্য হতে পারে না।
জনসাধারণের বিশেষ করে বয়স্কদের সুরক্ষা বিধানে অবশ্যই সুস্পষ্ট সরকারি কর্মসূচি একান্ত প্রত্যাশিত। বাস্তবতা বিবেচনায় লকডাউন কার্যকর করা না গেলে আরও কিছু পদক্ষেপ অবশ্যই নেয়া যেতে পারে। তার মধ্যে উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাপকভাবে খোঁজে বের করে পরীক্ষা করা এবং শনাক্তকৃত আক্রান্তদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলিশনে আনা জরুরি। আক্রান্তদের নিজের বাসায় রেখে দেওয়া অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অবস্থা সংকটাপন্ন হলে হাসপাতালে আনার আগেই অনেকের প্রাণহানির আশংকা রয়েছে।
সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবেন আশা করি।