প্রাথমিকে শিক্ষক নেই ৮৩ জন, পাঠদান ব্যহত

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দ. সুনামগঞ্জ
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাঁক ইউনিয়নের মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ শ ৩০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষক থাকার কথা ৬ জন। কিন্তু আছেন মাত্র ৩ জন। তাদের মধ্য থেকে ১ জন শিক্ষক আছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আর ১ জন প্রাক্ প্রাথমিকের। সাধারণ সহকারি শিক্ষকের মূল দায়িত্বে ৪ জন থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছেন মাত্র ১ জন। কর্মরত প্রতিজন শিক্ষকের ভাগে গড়ে ৭৬ জন শিক্ষার্থীকে বিরতিহীনভাবে শিক্ষাদানের দায়িত্ব ন্যস্ত । এমন অবস্থায় চরম শিক্ষক সংকটে ধুকছে হাওরের উঠান খ্যাত দক্ষিণ সুনামগঞ্জের এই প্রতিষ্ঠানটি।
পাথারিয়া ইউনিয়নে পাথারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হিসেবটা একই রকম না হলেও শিক্ষক সংকট এখানেও। শিক্ষা কার্যালয়ের সূত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪শ ৭৩ জন। সহকারি শিক্ষকের মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ৪ জন থাকলেও কর্মরত আছেন ৩ জন। আছেন প্রাক্ প্রাথমিক ১ জন ও প্রধান শিক্ষক। সাধারণ সহকারি শিক্ষকের ১টি পদ চলতি দায়িত্ব জনিত কারণে শূন্য রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি চরম শিক্ষক সংকটে ভোগছে।
এ তো শুধমাত্র দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দুই ইউনিয়নের দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র। এমন অবস্থা বিরাজ করছে উপজেলার ৮ ইউনিয়নের ৯৭ টি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৪৬ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে একটি কোমলমতি শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেয় সেখানে এমন একটি সমীকরণ সকলকে অবাকই করে! এ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কেমন মান এ সমীকরণ তা সহজেই বলে দেয়। সাধারণ অভিভাবকেরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকার এখন শিক্ষার মান আগের তুলনায় অনেক বাড়িয়েছে। কিন্তু একটি উপজেলায় যদি এতো শিক্ষক কম থাকেন তাহলে শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠু শিক্ষা পাবে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসসূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ৯৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঝে ৪৬ টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার ৫শ ১৩ জন শিক্ষার্থীদের বিপরীতে অনুমোদিত পদে ১শ ৮৩ জন সহকারি শিক্ষক, ৪৬ জন প্রধান শিক্ষক ও ৪৬ জন প্রাক্ প্রাথমিকের শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও প্রধান শিক্ষক আছেন ২৭ জন, সহকারি শিক্ষক ১শ ২৫ জন ও প্রাক্ প্রাথমিকের শিক্ষক ৪০ জন। মোট ৫৮টি সহকারি শিক্ষকের শূন্য রয়েছে।
তথ্যসূত্রে জানায়, জয়কলস ইউনিয়নের ৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৮ জন, শিমুলবাঁকের ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৬ জন, পাথারিয়ার ৪টি প্রতিষ্ঠানে ৫ জন, পূর্ব বীরগাঁওয়ের ৩টি প্রতিষ্ঠানে ৫ জন, পশ্চিম বীরগাঁওয়ে ৮টি প্রতিষ্ঠানে ১২ জন, পশ্চিম পাগলায় ৩টি প্রতিষ্ঠানে ৪ জন, পূর্ব পাগলায় ৫টি প্রতিষ্ঠানে ৮ জন ও দরগাপাশায় ৮টি প্রতিষ্ঠানে ১০ জন শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়াও শূন্য রয়েছে ১৯ জন প্রধান শিক্ষক ও ৬ জন প্রাক্ প্রাথমিকের শিক্ষকের পদও।
পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আমজদ আলী বলেন, ‘শিক্ষক শূন্যতা থাকতেই পারে। তাই বলে একটি উপজেলায় প্রাথমিক লেভেলে ৮৩ জন শিক্ষক নেই, সেটি আশংকা প্রকাশ করারই বিষয়। তাহলে আমাদের ছেলে-মেয়ে সঠিক শিক্ষা কিভাবে পাবে। আমরা সরকারের কাছে একটাই দাবি করছি, এতো উন্নয়নের দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় আরো দ্রুত গতিতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা হয়।’
দরগাপাশা ইউনিয়নের বিশিষ্ট্য শিক্ষানুরাগী মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে জানি। হলদারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০০৬ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দ্বারা চলছে। এভাবে শূন্য পদ থাকলে শিক্ষার্থীরা অঙ্কুরেই মেধাশূন্য হয়ে বেড়ে উঠবে। ’
পাথারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাহ্মুদা চৌধুরী রোজী বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে ভবন ও শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থী খুব বেশি। আমাদের ভবন দরকার। শূন্য পদ ১ টি থাকলেও আমার শিক্ষক প্রকৃতপক্ষে আরো ২ জন দরকার। ’
মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রঞ্জিত কুমার দে তার দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এই এলাকায় কোনো শিক্ষকই আসতে চান না। এমনকি এই ইউনিয়নের শিক্ষকরাও এখানে আসতে চান না। প্রায় ৪ শ শিক্ষার্থীল জন্য আমরা মাত্র ৩জন শিক্ষক। আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আছি। জরুরি কাজে উপজেলা সদরে যেতে হলে স্কুলের বেহাল দশা হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করবো আরো শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো সচল করতে।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বজলুর রহমান বলেন, ‘কোনো রকমে জোড়াতালি ও ডেপুটেশনের মাধ্যমে চালাচ্ছি। গত নিয়োগে ১৮ জন পেয়েছি। তবু প্রচুর চাহিদা রয়ে গেছে। চাহিদা দিয়েছি, আগামী নিয়োগে হয়তো আরো বেশি শিক্ষক পাবো। আস্তে আস্তে সব সংকটই দূর হবে।’